মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেশ কিছু গাছ বিক্রি করে কেটে ফেলেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। রবিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সরেজমিনে গণমাধ্যমকর্মীরা গিয়ে দেখতে পান, লৌহজং উপজেলার মেদিনী মণ্ডল আনোয়ার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরের বেশ কিছু ইউক্যালিপটাস/আকাশমনি গাছ কাটছে কাঠুরে শ্রমিকরা। ওই দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসব গাছকে আগ্রাসী ও ক্ষতিকারক বলে উল্লেখ করে তাঁর মদদপুষ্ট স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে এ কাজ করাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ এসব গাছ কাটা বা বিক্রি করতে হলেও সরকারি নিয়ম-নীতি মেনে করতে হয়। কিন্তু তিনি সেসব নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই নিজের অদৃশ্য ক্ষমতা খাটিয়ে গাছগুলো বিক্রি করে কেটে ফেলার আয়োজন করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজ ক্ষমতা খাটিয়ে অত্র বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য মো. ঝিলু হাওলাদারের কাছে নামমাত্র মূল্যে গাছগুলো বিক্রি করেন। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গাছ কাটতে হলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বন বিভাগকে অবগত করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও তিনি সেই নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই বিদ্যালয় ছুটির দিনে গাছ কাটা শুরু করেন।
বিদ্যালয়টির আশপাশজুড়ে বিভিন্ন প্রকার প্রচুর গাছ ছিল। এর আগেও তিনি এভাবেই বেশ কিছু গাছ বিক্রি করে দিয়ে পুরো বিদ্যালয় এলাকা খালি করে দেন। ব্যক্তিগত টাকার প্রয়োজন হলেই তিনি এসব গাছ বিক্রি করতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে—পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে আগ্রাসী প্রজাতির ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উক্ত আগ্রাসী প্রজাতির গাছের পরিবর্তে দেশীয় প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে বনায়নের নির্দেশনা রয়েছে।
এছাড়া গাছ কাটার ব্যাপারেও সঠিক নিয়ম পালনের নির্দেশনা রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় ১৬ জুন ২০২৫ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নিষিদ্ধ, কারণ এগুলো আগ্রাসী প্রজাতি। পুরোনো বা ঝুঁকিপূর্ণ গাছ কাটার জন্য জেলা বা উপজেলা কমিটির অনুমোদন এবং বন বিভাগের ৩ নম্বর ফরম পূরণ করে আবেদন করতে হয়।
গাছ কাটার বিষয়ে মেদিনী মণ্ডল আনোয়ার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ইউএনও সাহেব বিষয়টি জানেন। গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের মুখে তিনি পরক্ষণেই বক্তব্য পরিবর্তন করে বলেন, কয়েক মাস আগে বিদায়ী ইউএনও তাঁকে মৌখিকভাবে বলেছেন। ইউএনও নিয়ম উপেক্ষা করে মৌখিক অনুমোদন দিতে পারেন কি না জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এমনকি এ বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশন বা অনুমতির কোনো সঠিক কাগজপত্রও দেখাতে পারেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ মর্তুজা আহসান বলেন, “আমি যেহেতু এ কমিটির সদস্য নই, তাই এ বিষয়ে কিছু জানি না। জেনে জানাব।”
তিনি আরও বলেন, “গাছ কাটার বিষয়ে আমাকে লিখিত বা মৌখিকভাবে জানানো হয়নি। বিদ্যালয়ের গাছ কাটার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। বিদ্যালয়ের গাছ কাটতে হলে কারণ উল্লেখ করে ম্যানেজিং কমিটির রেজুলেশনসহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন দাখিল করতে হয়। এখানে একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষেই গাছ কাটা যাবে। কমিটির সদস্য স্থানীয় বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।”
জানতে চাইলে লৌহজং বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা মো. সেলিম বলেন, “কোনো প্রতিষ্ঠানের গাছ কাটতে হলে প্রথমে বন বিভাগকে অবগত করে গাছ মেপে মূল্য নির্ধারণ করতে হয় এবং বিক্রয়ের জন্য টেন্ডার আহ্বান করতে হয়। মেদিনী মণ্ডল আনোয়ার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের গাছ কাটার বিষয়ে আমাকে অবগত করা হয়নি।”
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মেদিনী মণ্ডল আনোয়ার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি ফারজানা ববি মিতু বলেন, “বিষয়টি আমার জানা আছে। আমি তাঁকে সময় দিয়েছি। এর মধ্যে সব কাগজপত্র আমার কাছে জমা দিতে হবে।”
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

