খাদ্যশস্যখ্যাত দেশের উত্তরের জেলা নওগাঁ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার) আসন একসময় ছিল ধানের শীষের দুর্গ। তবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অনৈক্য এবং মনোনয়নপ্রত্যাশীর ভিড়ে সেই ঘাঁটি পুনরুদ্ধার এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে একক প্রার্থী ঘোষণা করে বিএনপির এই ঘাঁটিতে হানা দিতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ভোটের মাঠে এখন সবাই খুলে বসেছেন নির্বাচনী অঙ্কের হিসাব-নিকাশের খাতা। শীতের সকালে গ্রামের সংসদ চা-দোকানগুলোতে গরম চায়ের কাপ সামনে নিয়ে চলছে রাজনৈতিক আড্ডা। এসব আড্ডায় আলোচনার কেন্দ্রে একটাই প্রশ্ন—কোন প্রার্থী জিতলে নওগাঁ-১ আসনের উন্নয়ন হবে? বিএনপি যদি বিভক্ত থাকে, তাহলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক এখানে বড় চমক দেখাতে পারে—এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, ১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থীকে হারিয়ে এই আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ডা. ছালেক চৌধুরী আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের কাছে পরাজিত হলে আসনটি হাতছাড়া হয় বিএনপির।
২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সাধন চন্দ্র মজুমদার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ ও ২০২৪ সালের একাদশ ও দ্বাদশ সংসদের দুটি বিতর্কিত নির্বাচনে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
নওগাঁ জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁ-১ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৬৬টি। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭৭ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৪ জন এবং হিজড়া ভোটার ৪ জন।
তরুণ ভোটার মাসুদ রানা বলেন, “নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার ধান ও আম উৎপাদনে শীর্ষ উপজেলা। যে প্রার্থী বোরো মৌসুমে সেচের খরচ কমানো, ডিজেল ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ বন্ধ, মানসম্মত বীজ ও সার নিশ্চিত করতে পারবে—আমরা তাকেই ভোট দিতে চাই। এখন সরকারি দামে প্রান্তিক কৃষকেরা সার পায় না। সেচ পাম্প মালিকরা অতিরিক্ত টাকা নেয়। এসব সমস্যার সমাধান চাই।”
বয়স্ক ভোটার মোজাম্মেল হক বলেন, “বয়স্ক, বিধবা ও ভিজিএফ-ভিজিডি কার্ড বিতরণে দলীয় তালিকা নয়, ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। যে প্রার্থী ভোটের পর আমাদের পাশে থাকবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, “শেষ মুহূর্তে বিএনপি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে শক্ত প্রার্থী দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জামায়াত এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ভোট মেরুকরণে এগিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও ধর্মভিত্তিক ভোটারদের সক্রিয় করতে অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলমের ব্যক্তিগত উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। বিএনপি বিভক্ত থাকলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বড় চমক দেখাতে পারে।”
নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “নওগাঁ-১ আসনে বিএনপি আমাকে বড় দায়িত্ব দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আমি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলাম। কিন্তু ফ্যাসিবাদী শক্তি আমাকে সংসদে যেতে দেয়নি। এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আবারও জনগণের কাছে এসেছি। নির্বাচিত হলে আগের মতোই জনগণের পাশে থাকব এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়তে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।”
অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্য ও নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. ছালেক চৌধুরী বলেন, “আমি আমার এলাকার মানুষের জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো মন্তব্য নেই। এখন শুধু নির্বাচনের দিকেই মনোযোগ দিচ্ছি। আশা করছি সাধারণ ভোটাররা আমাকে মোটরসাইকেল প্রতীকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাবেন।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নওগাঁ জেলা শাখার প্রার্থী অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম বলেন, “বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এ আসনে জামায়াতে ইসলামী বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। বিএনপির মধ্যে গ্রুপিং ও চাঁদাবাজির সমস্যা রয়েছে। আমরা এলাকার মাটি ও মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এই অঞ্চলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সংসদে যাওয়াই একমাত্র পথ।”
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

