ঢাকা রবিবার, ০৫ ডিসেম্বর, ২০২১, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

এক ইব্রাহিম মেমোরিয়ালে চার গ্রামের হাঁসি 


Ekushey Sangbad
উপজেলা প্রতিনিধি
০৩:৪৭ পিএম, ৩০ অক্টোবর, ২০২১
এক ইব্রাহিম মেমোরিয়ালে চার গ্রামের হাঁসি 

নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার ৮নং বিজবাগ ইউনিয়নের বীর নারায়নপুর গ্রামে অবস্থিত ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের দাতব্য চিকিৎসকাকেন্দ্র থেকে প্রতি সপ্তাহে চিকিৎসা নিচ্ছেন নিজ গ্রামসহ পাশবর্তী গ্রাম রাজারামপুর, কাজীরখিল ও বীজবাগ গ্রামের সাধারন মানুষেরা। 

২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে জনসাধারনের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে 
যাচ্ছে। যেখানে সাধারণত চিকিৎসার নাম নিতেই হাজার টাকা ব্যয় করা লাগে সেখানে ইব্রাহিম মেমোরিয়ালের প্রশংসনীয় এমন উদ্যেগে খুশি চার গ্রামের হাজারো দিনমুজুর মানুষ। 

স্থানীয়দের মতে, তাদের গ্রামটি নোয়াখালী জেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়ায় ফেনী ও নোয়াখালী জেনারেল হাসাপাতালে যাতায়াত তাদের জন্য দুর্বেধ্য।  ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনটি তাদের গ্রামের বহু মানুষের কষ্টের লাগব কমিয়েছে। তাদের চিকিৎসাসেবায় অন্তুর্ভূক্ত রয়েছে বিনামূল্য চিকিৎসকের পরামর্শ, ফ্রি মেডিসিন সেবা ও জটিল রোগীদের জন্য বিনামূল্যে অপারেশন ইত্যাদি। 

পরিত্যক্ত কাচারি থেকে ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন 
বীর নারায়নপুর গ্রামের ওয়াছিল ভূঞা বাড়ীর মরহুম ইব্রাহিমের সন্তান জসিম উদ্দিন ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়িতে এসে দেখেন বাড়ীর দরজায় কাচারিতে অবস্থিত তার শৈশবের প্রথম ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গন মক্তবটা প্রায় পরিত্যক্ত। কাচারিতে হাটছে গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদি। তখনই জসিমের প্রাণ কেদেঁ উঠেছিল এবং তার মধ্যে একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। আকাঙ্খাটা ছিল এই মক্তবকে আবার পুনুরুদ্ধার করবেন তবে ঠিক তখনও তিনি কল্পনা করতে পারেন নাই দুই যুগ পর তার প্রতিষ্ঠানটি চারটি গ্রামের মানুষকে সেবা দিয়ে যাবেন। 

পরে ২০০১ সালের পহেলা জানুয়ারিতে জসিম উদ্দিন শুধুমাত্র তার পিতা মরহুম ইব্রাহিম মিয়ার নামে একটি ফাউন্ডেশন খুলে সেখানে শিশুদের ফ্রি ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। শুরুতেই ৪০ জন শিক্ষার্থী সেখান থেকে বিনামূল্য ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহন করেছিল। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি চলতো নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা। 

পরে ২০০৭ সালে জসিম উদ্দিন ফের বাংলাদেশে আসলে ইব্রাহিম মেমোরিয়ালে একটি লাইব্রেরীর অভাববোধ করেন। সেই বছরই ফাউন্ডেশনে যুক্ত হয়েছিল দেড় শতাধিক বই এবং দৈনিক দুইটি জাতীয় পত্রিকাসহ একটি পাঠাগার। তখন থেকেই পাঠাগারটি এলাকার সাহিত্য সমৃদ্ধে ভূমিকা রেখে আসছে। তার সাথে সাথে ফাউন্ডেশনটি এলাকার দূস্থ মানুষদের সহযোগিতা করে আসছে। সর্বশেষ এলাকার মানুষের চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তা করে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ইব্রাহিম মেমোরিয়াল দাতব্য চিকিৎসালয় শুরু করেন। দাতব্য চিকিৎসালয়ের ব্যাপারে ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পনেরো বছর আগে আমাদের গ্রাম থেকে ফেনী ও নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল দূরে হওয়ায় আমার ছোট বোন সুচিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাই এই গ্রামের সাধারণ মানুষের কথা ভেবে আমরা আমাদের ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সাথে দাতব্য চিকিৎসালয় শুরু করি। 

মরহুম ইব্রাহিম মিয়া- ইব্রাহিম মেমোরিয়াল! বর্তমান চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিনের পিতা মরহুম ইব্রাহিম মিয়া বীর নারায়নপুর গ্রামে ওয়াছিল ভূঞা বাড়িতে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে যে তিনি ছিলেন একজন বঙ্গবন্ধু প্রেমিক। 

পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে তরুন বয়সেই সংসারের হাল ধরেন। ১৯৬৪ সালে বিএডিসি তে যোগদান করেন। পরে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ঐ চাকরি থেকে পদত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছিলেন। দুষ্কৃতিকারীরা যেদিন বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেন সেদিন বাচ্চা ছেলের মতো কান্না করে বলেছিলেন, যে মানুষটা দেশের জন্য এতো কিছু করলো আমরা তাকে মেরে ফেললাম। 

মোহাম্মদ ইব্রাহিম মিয়া ১৯৯১ সালে উপজেলার ছমিরমুন্সির হাটে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তিনি তিন ছেলে এবং তিন মেয়ে রেখে যান। তাদের মধ্যে বড় মেয়ে ২০০৫ সালে অসুস্থতাজনিত কারনে মৃত্যুবরণ করেন। বাকী পাঁচ সন্তান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। 
স্থানীয় বিশিষ্টজনরা কি বলছেন

সেনবাগ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সেবারহাট মেডিকেল সেন্টারের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের একুশে সংবাদকে বলেন, আমাদের সেনবাগের প্রাইভেট হাসপাতাল গুলো এখানে চিকিৎসা সেবায় ভালো একটা ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু ইব্রাহিম মেমোরিয়ালের ব্যাপারটা ভিন্ন। তারা যেভাবে বিনামূল্য মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এটার জন্য প্রশংসা পাওয়ার যৌগ্যতা রাখে। এলাকার অনেক খেটে খাওয়া মানুষের ভালোবাসার স্থান ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন। আমাদের সংগঠন ওয়েলফেয়ার ব্লাড এন্ড সৌস্যাল ফাউন্ডেশনের বন্ধু সংগঠন ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন। 

রিভিউ হিউম্যান রাইটসের সেনবাগ শাখার নির্বাহী সভাপতি নিজাম উদ্দিন বলেন, ইব্রাহিম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে অনেক বিশাল একটা কিছু ঐ চারটি গ্রামের জন্য। স্বাস্থ্যসেবা ছাড়াও তারা ভিবিন্ন নৈতিক শিক্ষামূলক কর্মকান্ড করে যাচ্ছে যার ফলে ঐ গ্রামে কিশোর তরুনদের অপরাধ প্রবণতা কম। 

ইউজিবির সেনবাগ উপজেলা সভাপতি সামছুল আরেফিন মাসুদ বলেন, ইব্রাহিম মেমোরিয়াল আমাদের এখানের জন্য একটা আদর্শবান প্রতিষ্ঠান। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্র নাগরিক জসিম উদ্দিনের সহযোগিতায় এটি একটি মডেল সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে তারা একটা হাসপাতাল নির্মানের কাজ করেতেছে। যেখান থেকে বিনামূল্যে সেবা পাবে এই জনপদের মানুষ। এছাড়াও তারা নারীদের কর্মসংস্থানের  অগ্রগতি হিসেবে ৮০ জনকে ফ্রি সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।  

স্থানীয় সেবারহাট বাজারের ব্যবসায়ী নূর জাহান গ্যালারির স্বত্বাধিকারী মোঃ ইমাম হোসেন বলেন, এই হাসপাতালটি হওয়ায় এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছে। আর সামাজিক কল্যণেও কাজ করে যাচ্ছে তারা।

একুশে সংবাদ/এসএস/এএমটি