ঢাকা শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. পডকাস্ট

অপ্রতিরোধ্য ভিক্টর


Ekushey Sangbad
বশির হোসেন খান
১০:০২ পিএম, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৩
অপ্রতিরোধ্য ভিক্টর

  • দুর্ঘটনা ঘটলেই দাম রং পরিবর্তন করে ভিক্টর ক্লাসিক ও আকাশ আবার কখনো সুপ্রভাত।
  • ফিটনেসহীন, রাস্তার মধ্যে যাত্রী-ওঠা-নামা যথেচ্ছ পার্কিং, চালক বেপরোয়া। ট্রাফিক ম্যানেজ করলে সব ঠিক।

 

‌‘মানুষ থেকে লাশ’ শিরোনামে শরীয়াতপুরের জাজিরায় সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সে নিহত ৬ যাত্রীর সংবাদে শিহরিত হয়েছিলো সারাদেশের মানুষ। মর্মান্তিক সেই দুর্ঘটনায় মাকে চিকিৎসা দিতে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসার পথে মা-মেয়েসহ সবাই নিহত হয়েছিলেন।

মৃত্যুজালে জীবন!

 

সেই হৃদয় বিদারক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত রোববার রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের সড়কে অপ্রতিরোধ্য ‘ভিক্টর’ পরিবহন কেড়ে নিলো নর্দান ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়ার প্রাণ। এ ঘটনায় ফুঁসে উঠে ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সড়ক অবরোধ করে তাদের টানা আন্দোলনের মুখে সোমবার (২৩ জানুয়ারি) ভিক্টর পরিবহনের রুট পারমিট বন্ধের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

 

প্রতিনিয়তই সড়কে ঝরছে রক্ত। দুর্ঘটনা পর পরিবহনের চলাচল নিষিদ্ধ হলেও নাম এবং রং পরিবর্তন করে দাপটের সঙ্গে দাবিয়ে বেড়াচ্ছে সড়কে। নেই ফিটনেস, রাস্তার মধ্যে যাত্রী-ওঠা-নামা। ফেরেনি গণপরিবহনে শৃঙ্খলা। যথেচ্ছ পার্কিং। চালক বেপরোয়া। ট্রাফিক ম্যানেজ করলে সব ঠিক।

 

সুত্র বলছে, ২০১৯ সালের পর থেকেই একই দুর্ঘটনা ঘটলেই পরিবহনের নাম রং পরিবর্তন করে কখনো আকাশ ও ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহন। আবার কখনো সুপ্রভাত নামে চলছে একই পরিবহন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ওই সময় ঘাতক সুপ্রভাত পরিবহন কোম্পানির রুট পার্মিট বাতিল করা হয়। সুপ্রভাত কোম্পানি বন্ধ হলেও ওই কোম্পানির বাস কিন্তু বন্ধ হয়নি। ভিক্টর পরিবহন ও আকাশ কোম্পানিতে যুক্ত হয়েছে। এই বাসটি টঙ্গী থেকে কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত চলাচল করে।

 

অভিযোগ উঠছে, পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা, কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও গাড়ি মালিকদের দাপটে রাজধানীতে চালক-হেলপাররা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছে না। বিপজ্জনক ওভারটেকিং ও যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস নিয়ে তারা মরণ ঝুঁকির পাল্লাপাল্লিতেও লিপ্ত হচ্ছে অহরহ। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যাত্রী-পথচারীরাও প্রাণ হারাচ্ছেন গাড়ির চাপায়।

রাজধানীতে পাল্লাপাল্লি করতে গিয়ে ভেঙে পড়লো বাস

 

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আসল চিত্র। রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি পরিবহন ব্যবসায় জড়িত। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন রয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা। শীর্ষ সারির সাবেক দুই পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন যাদের বিভিন্ন কোম্পানিতে বেশকিছু বাস রয়েছে। আর এসব ব্যক্তির গাড়িতেই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে।

 

পুলিশেরই মাঠপর্যায়ের একাধিক সদস্য বলেছেন, ওই বাস দু’টির চালকরা এতটাই বেপরোয়া, তারা কখনো কিছুই তোয়াক্কা করে না। ইচ্ছেমতো গাড়ি চালায়। তাদের ধারণা ওই গাড়ি কোনো পুলিশ আটক করতে পারবে না। ২০১৯ সালের গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে মহাখালীতে ফুটপাতে উঠে বাস চাপায় নিহত হন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মকর্তা ফারহানাজ (২৮)। নিহতের চার বছরের কন্যা সন্তান ইসরা এখনো জানে না ঘাতক বাস চালক তার মায়ের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। একই দিন সকালে উত্তরায় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন সংগীত পরিচালক ও শিল্পী পারভেজ রব। দুই দিনের ব্যবধানে এ ঘটনায় প্রতিবাদ করায় ওই বছরই ৭ সেপ্টেম্বর উত্তরায়ই ভিক্টর পরিহবনের আরেকটি বাস চাপা দিয়ে হত্যা করে মেহেদী হাসান ছোটনকে (২০)। নিহত শিল্পী পারভেজ রবের ছেলের বন্ধু ওই ছোটন। একই বাসের ধাক্কায় রবের ছেলে আলভী রবও আহত হন। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলায় বেপরোয়া বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে দুই শিক্ষার্থী নিহত হন।

ভাটারায় ভিক্টর বাসের ধাক্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী নিহত

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকার উত্তরা-বাড্ডা-রামপুরা-কাকরাইল রুটের আতঙ্কের নাম ভিক্টর, আকাশ পরিবহন। এসব বাস সড়কে চলাচলে কোনো নিয়ম-কানুনের ধার ধারে না। যেখানে ইচ্ছা সেখানেই হঠাৎ করে বাস থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করাচ্ছে। আবার নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে বেপরোয়া গতিতে বাস চালাচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে বাসগুলো আগের মতোই এলোপাতাড়িভাবে পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে, বাসের গেট বন্ধ রাখা হচ্ছে না। বাসের ভেতরে চালকের ছবি ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফটোকপি ঝুলিয়ে রাখা হয়নি। চোখের সামনে ঘটলেও রহস্যজনক কারণে ট্রাফিক পুলিশও এসব বাস চালকদের আইনের আওতায় আনছেন না।

 

ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। যাতায়াত ক্ষেত্রে নিত্য ভোগান্তির শিকার ক্ষুব্ধ নাগরিকরা বলেন, দেশের সর্বত্র উন্নয়নের আলো পৌঁছালেও পরিবহন সেক্টরে এখনো রয়েছে যেন দুর্ভিক্ষের ছাপ। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন। বাস-মিনিবাসের বাম্পারসহ নানা অংশ খুলে ঝুলতে থাকে বিপজ্জনকভাবে। কোনোটির রং চটা, কোনোটির ছাল ওঠা।ফিটনেসবিহীন শত শত গাড়ির ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে রাজধানী। রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন।

তা হলে আমার মুখ থাকবে না: ইলিয়াস কাঞ্চন

নিশচা’র চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন, ফাইল ছবি

এ ব্যাপারে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে সড়কে ফের চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। প্রায় দিনই সড়কে মানুষের প্রাণ ঝরছে। এসব চালকের লাগাম টেনে ধরা জরুরি।

 

এ ব্যাপারে বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, চালকরা এমনিতেই বেপরোয়া। আর যে গাড়ির মালিক যত ক্ষমতাধর সেই গাড়ির চালক ততটাই বেপরোয়া হবে; এটাই যেন স্বাভাবিক।

 

স্বপ্ন ছিল বড় ফার্মাসিস্ট হবে: নাদিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মেয়ের স্বপ্ন ছিল বড় ফার্মাসিস্ট হবে। আমার সব শেষ। আমি পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলাম।

বাসচাপায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী নিহত: বিচারের দাবিতে সহপাঠীদের সড়ক অবরোধ

 

শিক্ষার্থী নাদিয়া সুলতানা নিহতের ঘটনায় চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছে ভাটারা থানা পুলিশ। সোমবার সকালে বাড্ডার আনন্দনগরের সার্জেন্ট টাওয়ারের পেছনে ভাড়া বাসা থেকে বাসচালক মো. লিটন (৩৮) ও হেলপার মো. আবুল খায়েরকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়।  বাসচালক লিটন ভোলা সদরের ইলিশার মো. কালু মিয়ার ছেলে ও হেলপার আবুল খায়ের একই জেলার সদরের বিদুরিয়া গ্রামের হাসেম গরামীর ছেলে।

 

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি আ. আহাদ বলেন, ভাটারা থানার ওসির নেতৃত্বে একাধিক টিম অভিযান শুরু করে। রাতেই সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত বাসের চালক ও হেলপারকে শনাক্ত করা হয়। ভিক্টর পরিবহনের বাসচাপায় এর আগেও শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতায় বাসে বাসে রেষারেষি বন্ধ হয়েছিল। এখন আবার শুরু হয়েছে।

 

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে সারাদেশে সড়কপথে ৫ হাজার ৭০টি দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৭৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে রেলপথে ২৫৬টি দুর্ঘটনায় ২৭০ জন এবং নৌপথে ৭৭টি দুর্ঘটনায় ২০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গেল বছর সড়ক, রেল ও নৌপথে ৭ হাজার ২৪টি দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ১০৪ জনের মৃত্যু এবং ৯ হাজার ৭৮৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অপ্রকাশিত তথ্য ও হাসপাতালে ভর্তির পর এবং হাসপাতাল থেকে রিলিজের পর আনুমানিক ১ হাজার ৮৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর সবচেয়ে বেশি ৬৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে মার্চে এবং সবচেয়ে কম ৩৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে অক্টোবর মাসে।

 

৮ দফা দাবিতে সড়কে শিক্ষার্থীরা: গত রোববার ক্লাস না থাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে তার মোটরসাইকেলে বই কিনতে উত্তরার বাসা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যাচ্ছিলেন নাদিয়া। দুপুর পৌনে ১টার দিকে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় তাদের মোটরসাইকেলটি একটি বাস ধাক্কা  দেয়। এতে রাস্তায় ছিটকে পড়েন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় মহাসড়ক অবরোধ, তীব্র যানজট

 এরপর বাসটি নাদিয়াকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এসময় নাদিয়ার বন্ধুও গুরুতর আহত হন। সড়ক দুর্ঘটনার পরই ৮ দফা দাবি আদায়ে সড়কে আন্দোলনে বসে শিক্ষার্থীরা। গতকাল শুলশান ডিসির হস্তক্ষেপে আন্দোলন প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীরা।

 

জানা গেছে, যে বাসটি তাদের ধাক্কা দিয়েছে সেটি একসময় ছিল সুপ্রভাত পরিবহনের। নাম বদলে হয়েছে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহন। সুপ্রভাতের মতো ভিক্টর পরিবহনও এর আগে সড়কে চাপা দিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়েছে। নাম বদলেও এই বাসটির থামছে না সড়কে দুর্ঘটনা। এরপর ভিক্টর ক্লাসিক, আকাশ, সম্রাট ট্রান্সলাইন নাম ধারণ করে একই রুটে চলাচল শুরু হয় প্রাণঘাতী সুপ্রভাতের বাস। গায়ের রং আর নাম পাল্টালেও পাল্টায়নি সড়কে মানুষ চাপা  দেওয়ার ঘটনা।

চার দফা দাবি ঘোষণা করে অবরোধ তুলে নিয়েছে শিক্ষার্থীরা

 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনা বাড়বেই। তা ছাড়া সর্বত্র মৃত্যুজাল। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ থেকে লাশ হচ্ছে প্রতিনিয়তই। তবুও মানুষের মধ্যে সচেতনা নেই।

 

একুশে সংবাদ/এসএপি