ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭
Ekushey Sangbad
Janata Bank
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ নির্দেশনা

‘দেশে বিদেশে যেখানেই থাকি, দেশি গাছ-পালাদের ভালোবাসি’


Ekushey Sangbad
লুনা রাহনুমা
অক্টোবর ১৩, ২০২০, ০৯:১৭ পিএম
‘দেশে বিদেশে যেখানেই থাকি, দেশি গাছ-পালাদের ভালোবাসি’

কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশের মানুষ আমরা। জীবন-জীবিকা, কিংবা ভাগ্যের টানে আমরা অনেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আবাস গড়েছি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। গরমের দেশের মানুষ, ঠান্ডাকে ভয় পাই। তবুও কষ্ট করে আমাদের শরীর মানিয়ে নেয় অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা দেশের শীতল আবহাওয়ার সাথে। মোটা জ্যাকেট, লেপ-কম্বল, কান টুপি, হাত মোজা আর পা মোজার ভারী আস্তরণে ফুলিয়ে ফেলি আমাদের শরীর। কিন্তু মনের ভেতর ঠিকই জেগে থাকে বাংলাদেশে ফেলে আসা আমাদের চিরচেনা দিনযাপনের ইতিহাস, খাদ্যাভ্যাস। খুব মিস করি মায়ের হাতের ফুলকপি-আলুর তরকারি, তাজা মটরশুঁটির ঝোল, ঝিঙে-পোস্ত, লাউ, মিষ্টি কুমড়ো - আরো যত রকমের শাক সবজি।

আজ আমি বিলেতে বসবাসকারী বাঙালিদের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা এক অনিন্দ্য সুন্দর সবুজ মাঠের গল্প জানাতে চাই আমার বাংলাদেশের পাঠকদের। এই সবুজমাঠ কেবলমাত্র একটি মানুষের বাগান বা কয়েক বিঘার একটি অরণ্য নয়। এই মাঠ ২৫০০ বাঙালির নিজ নিজ বাড়িতে তৈরি হওয়া সবুজের সমারোহ। অনেকগুলো টুকরো বাগান যেন একত্রিত হয়ে তৈরি করেছে বিশাল এক সবুজের মাঠ। দেশি ফুল ও ফলের বর্ণিল মিলনমেলা বর্তমানের ভার্চুয়াল জগতে।

বছরের শুরুতে কোরোনার কারণে পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে গেলো আচমকাই বিনা নোটিশে। স্কুল, অফিস, পার্ক, দোকান, বন্ধুর বাড়ির আড্ডা - সবকিছু যখন লক করে দেয়া হলো তখন জোর করে চেপে আসা অবসরটুকু কাজে লাগাতে আমাদের পরিচিত অধিকাংশ মানুষ বাগান করতে শুরু করে। প্রথমত সময়টা সামার, এমনিতেই গাছ লাগানোর সময়। দ্বিতীয়ত লকডাউনের কারণে মানুষরা বাধ্য হয়েই গৃহবন্দী। আর বন্দী মানুষের জন্য বোবা গাছের চেয়ে প্রিয় বন্ধু আর কে হতে পারে! কম মাংস আর বেশি শাক-সবজি খেলে তা যেমন আমাদের শরীরে মেদ বৃদ্ধির ঝামেলা কমায়, তেমনি মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ে। তাই চারপাশের সমমনা কিছু গাছ-প্রেমীর মাথায় প্রথম চিন্তা আসে পরিচিতজনদের ভেতর সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধুমাত্র গাছ গাছালির গল্প ও ছবি নিয়ে একটি প্লাটফর্ম তৈরি করলে কেমন হয়! সহজেই জুটে যায় গাছপাগল আরো অনেকজন। এই বছর ২৩শে জুন জন্ম নিলো বাংলাদেশী গার্ডেনার্স সোসাইটি, ইউকে নামে ভার্চুয়াল গার্ডেনটি। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ২৫০০ জনেরও বেশি।

বিজিএস এর এই পেইজে সদস্যরা তাদের বাগানে, ঘরে, ছাদে, টবে, কিংবা বোতলে ভরা পানিতে, পাথরে, নুড়িতে, যেকোনো ভাবে জন্মানো গাছের গল্প বলে। ছবি পোস্ট করে। গাছ নিয়ে অনেক রকম সমস্যার সমাধান তারা পেয়ে থাকে এই গ্রুপের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত কৃষিবিদদের কাছে কিংবা শুধুই বাগান করে পরিপক্ক জ্ঞান লাভ করা বাগানীদের কাছ থেকে। এই পেইজে নতুন করে বাগান করতে যাওয়া বাগানীদের খুব আলোচিত কিছু সমস্যা ছিল এমন: মরিচ গাছের পোকা দমন। লাউ, কুমড়া, মরিচ বা অন্যান্য গাছে ফুল হলেও ফল না দিয়েই ঝরে যাওয়া সমস্যার সমাধান। ভালো সবজি পেতে কেমন করে মাটি তৈরি করতে হবে সে পরামর্শও দেয়া হয়েছে বাগানীদের। ইংল্যান্ডের মাটিতে কচি নধর গাছেদের উপর স্লাগ (শামুক জাতীয় এক প্রাণী) খুব অত্যাচার করে, বাগান থেকে স্লাগ নির্মূল করার উপরেও অনেক আলোচনা করেছে এই পাতার ভুক্তভোগী সদস্যরা। এইভাবে একে অপরের কাছ থেকে বাগান বিষয়ক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নতুন পুরাতন বাগানীরা উপকৃত হচ্ছেন প্রতিদিন। ইংল্যান্ডে যেহেতু বছরের বেশিরভাগ সময়টা শীতকাল থাকে, তাই সামারে ফলানো শাক সবজিগুলো কেমন করে শীতকালের জন্য সংরক্ষণ করা যায় তার উপরেও বেশ কিছু ভিডিও তৈরি করেছে বিজিএস। নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছে নানারকম টিপস।

শিষ্টাচার, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি আমাদের উত্তরসূরিরা আমাদের কাছ থেকেই শিখছে। আমরা বাংলায় কথা বলছি বলেই তারাও বাংলা বলার চেষ্টা করে। তাই আমাদের সন্তানরা যেন আমাদের নিজস্ব খাবারগুলোকে ভুলে না যায় তার প্রচেষ্টা করা বিজিএসএর আরেকটি উদ্দেশ্য। ইংল্যান্ডে জন্মেছে যে শিশু সেও এখন দেখছে বাগানে লতানো করোলার গাছ, তিতা করোলা প্রথম কিছু দিন সে খায় না, কিন্তু একসময় ঠিকই শিখে যাচ্ছে করোলা খাওয়া, ঢেঁড়শ খাওয়া। নিজেই বলতে পারছে কোনটা দেশি পালং শাক আর কোনটা বিলেতি স্পিনাচ। বাচ্চাদেরকে গার্ডেনিংয়ে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিজিএস আয়োজন করেছিল শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। অসংখ্য শিশু নিজের বাগানে বসে তাদের নিজের অথবা বাবা মায়ের হাতে করা ফুল, ফল, বাগান, গাছের ছবি এঁকেছে। বিজিএস থেকে সনদপত্র দেয়া হয়েছে এই বাচ্চাদের যা ভবিষ্যতে তাদেরকে গাছের প্রতি মমতাশীল করতে ভূমিকা রাখবে নিঃসন্দেহে।

বাগানপ্রেমী মানুষের আগ্রহে উৎসাহিত হয়ে বিজিএস বেশ কিছু কার্যক্রম চালু করেছে। তারমধ্যে কয়েকটির কথা বলা যায়। পলিনেশনের থিম নিয়ে ধারাবাহিক গল্প লেখার চ্যালেঞ্জ: একেকজন লেখক একেকটি পর্ব লিখে তৈরি করছে একটি একক বৃহৎ গল্প। কৃষি আলোচনা ও আড্ডা নিয়ে লাইভ: সপ্তাহের প্রতি সোমবার রাত দশটায় জুমে আড্ডা হয় বাগান বিলাসীদের। বাগানের বিষয় ছাড়াও তারা মেতে থাকে হাসি, কৌতুক, গান আর গল্পে। প্রিয় এই আড্ডার নাম, বিজিএস লাইভ রেডিও। ভার্চুয়াল-সীড-ব্যাংক নামে নতুন একটি বিনিময় প্রথার ধারণা এনেছে বিজিএস বাগানীদের জন্য। বাগানীরা তাদের যার যার কাছে উচ্ছিষ্ট বীজ আছে সেটি তারা তাদের এলাকার বাগানীদেরকে জানায়। যার কাছে যে গাছের বিচি নেই, তিনি সেটি সংগ্রহ করে ঐ বাগানিকে তার চাহিদা মাফিক গাছের বিচি দেন নিজের কাছ থেকে। এভাবে বিচির আদান প্রদান করে সবাই সমৃদ্ধ করতে পারে নিজের বাগানটি। এই সীড ব্যাংকের পদ্ধতিতে দেশের বাইরে থেকেও বাঙালিরা বিলেতে জন্মানো সম্ভব এমন অনেক শাক-সবজি, ফল-মূল এবং ফুলের বিচি পেয়ে যাচ্ছেন সহজেই।

ভবিষ্যতে বিজিএস আরো বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার জন্য সংঘবদ্ধ হচ্ছে। যাতে রয়েছে বাংলাদেশের শাক-সবজি ইংল্যান্ডে সুপরিচিত করা। ইংল্যান্ডের বিভিন্নস্থানে আয়োজিত নানারকম প্রদর্শনীতে অংশগ্রহন করা। বিজিএস এর উদ্যোগে সদস্যদের কাজ ও শিল্পের জন্য প্রদর্শনীর আয়োজন করা। লন্ডনে একটি কৃষি মেলার আয়োজন করা,ইত্যাদি। এই সকল কর্মকান্ডে সার্বিক সফলতার জন্য বিজিএস ব্রিটেনে বসবাসকারী সকল বাংলাদেশিদের এক হয়ে কাজ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে।

আজব সংঘঠন এই বিজিএস। এখানে ক্লিক করলেই অবাক হতে হয়। বিলেতের মাটিতে বাঙালিরা ফলাচ্ছে থানকুনি পাতা, বিলাতি ধনিয়া পাতা, কলমি শাক, হেলেঞ্চার শাক, কচু, শশা, বেগুন, নাগা মরিচ, সন্ধ্যা মালতি, মাধবী লতা, বেলি, টগর, এমন কি প্রকান্ড কলা গাছ পর্যন্ত ভীষণ যত্নে শোভা পাচ্ছে লন্ডনের বাগানে। আমরা বিজিএসইরা পরস্পরের মধ্যে বাগানের ফল ফলাদি যেমন বিতরণ করি তেমনি ভুলি না আমাদের পাশের বাড়ির ইংলিশ বা পর্তুগিজ প্রতিবেশীটিকেও। নিজের দেশের ফুল দিয়ে তাদের সাথে সম্প্রীতি বাড়াই। আবার নিজের দেশের শাক সবজি উপহার দিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের পুষ্টিগুন আর আমাদের বাঙালি উপায়ে সেসব রান্না করার ধারণা। অবশ্য কথার ফাঁকে আমার দেশের নামটি তাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়ে আসি কৌশলে। এটা হচ্ছে আমাদের উদ্ভিজ্জ কূটনীতি।

ইংলিশরা যারা বাগান করতে ভালোবাসে তারা বাড়ির সামনে লাগায় ফুলের গাছ, বাড়ির পেছনের বাগানে থাকে শাক-সবজি বা ফলের গাছ। আমরা বাঙালিরা ভীষণ উৎসাহের সাথে বাড়ির সামনে পেছনে, জানালার ধারে, শেয়ার করা বাগান হলে অন্যের অংশেও লাগাই সবজির গাছ। সবুজ গাছে কোনো ফল যদি নাও হয়, চিরকালের চেনা সবুজ পাতাগুলো দেখলেই মনে যেন শিস দিয়ে উঠে সবুজ টিয়ার দল। এইভাবে আমরা নিজের শেকড়ের বুনন গেঁথে দিয়ে যাচ্ছি বিলেতের মাটিতে আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য।

বিঃদ্রঃ কেউ যদি প্রবাসী বাঙালিদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত হতে চান কিংবা এমনিতেই চোখ বুলাতে আগ্রহী হোন, দোয়া করে নিচের লিংকটিতে খোঁজ করবেন।
http://www.facebook.com/groups/1149819642051264/

 

লেখা : লুনা রাহনুমা
ছবি : বিজিএস, ইউকের পেইজ থেকে নেয়া

একুশে সংবাদ/এআরএম

Side banner