AB Bank
  • ঢাকা
  • শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

এগ্রো ট্যুরিজম উন্নয়নে বিনিয়োগে বিশাল সম্ভাবনা


Ekushey Sangbad
হাফিজ রহমান
০৮:৫৬ পিএম, ২৮ মার্চ, ২০২৬

এগ্রো ট্যুরিজম উন্নয়নে বিনিয়োগে বিশাল সম্ভাবনা

সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এ বাংলাদেশকে নিয়ে গর্বের কোনো শেষ নেই। এদেশের মাঠ-ঘাট, সাগর-নদী-পাহাড়-ঝরনা, হাওর-বাঁওড়, পাহাড়-টিলা আর ছায়া সুনিবিড় গ্রাম: একসঙ্গে সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ যা পত্রপত্রিকা বা বই পড়ে জানা সম্ভব নয়। তাই এইসব দেখার ও জানার আগ্রহে পর্যটক ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তর।

বাংলাদেশে যে কয়েক ধরনের পর্যটন রয়েছে তার মধ্যে এগ্রো ট্যুরিজম উল্লেখযোগ্য। আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় হচ্ছে এই এগ্রো ট্যুরিজম। বিশ্বে এগ্রো ট্যুরিজম বা কৃষি পর্যটনে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইন। তাছাড়া ফ্রান্স, নিউজিল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পর্তুগাল, নেপাল, আয়ারল্যান্ড, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও এরই মধ্যে এগ্রো ট্যুরিজমে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এর অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

এগ্রো ট্যুরিজম হলো অবকাশ যাপনের এমন এক ধরন, যেখানে অবকাশকালীন কর্মকাণ্ডের মধ্যে থেকে কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান আহরণ হয়। এছাড়াও ফল ও সবজি চাষ, ফল ও সবজি ক্রয়, ঘোড়ায় চড়া, নৌকায় চড়া, মধু আহরণ এবং স্থানীয় আঞ্চলিক বিভিন্ন পণ্য অথবা হস্তশিল্প সামগ্রী দেখা ও কেনার সুযোগ তৈরি হয়। কৃষকরা তাদের কৃষি জমিগুলোকে একটি গন্তব্যে পরিণত করে এবং তাদের পদ্ধতিগুলো লোকজনদের সঙ্গে শেয়ার করে। এক কথায় কৃষির আদ্যোপান্ত জানার সুযোগ তৈরি হয় এই এগ্রো ট্যুরিজমের মাধ্যমে।

কৃষি পর্যটন, পর্যটন শিল্পের সর্বশেষ ধারণা যা সাধারণত খামারে ঘটে। ভ্রমণকারীরা নতুন গন্তব্য আবিষ্কার করেন তখন মন্থর করতে চান। তারা তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থানীয়দের সঙ্গে দেখা করতে এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে চান এই বিষয়টি মাথায় রেখেই এগ্রো ট্যুরিজমের বিকাশ হয়। এগ্রো ট্যুরিজমের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ট্যুরিজম জড়িত যেমন:

খাদ্য পর্যটন: ফুড সাফারি সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। পর্যটকরা কোনো স্থানে ভ্রমণে গেলে সেই এলাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার চোখে দেখতে চায়। খাবার ও রন্ধনশৈলী এক একটি এলাকার ঐতিহ্য।

আয়ুর্বেদিক পর্যটন: ভারত ও শ্রীলংকাসহ আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশেই আয়ুর্বেদিক পর্যটন জনপ্রিয়। উদ্ভিদ, প্রাণী ও খনিজ উপাদান থেকে হিতকর এই চিকিৎসা পদ্ধতি পর্যটন গ্রামে সূচনা করতে পারলে পর্যটকদের তা সহজেই আকৃষ্ট করবে এবং চিকিৎসা গ্রহণের জন্য পর্যটন গ্রামে যাবেন।

জলাভূমি পর্যাটন: নদীমাতৃক আমাদের দেশ বাংলাদেশ। কৃষি ও নদী একে অপরের সঙ্গে নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। তাই জলক্রীড়া, নৌ-ভ্রমণ, নৌযানে রাত্রি যাপন ইত্যাদি এগ্রো ট্যুরিজমে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সংস্কৃতি পর্যটন: কৃষিভিত্তিক গ্রামীণসমাজে অনেক ধরনের সংস্কৃতি-রীতিনীতি রয়েছে। যেমন-পৌষে নবান্ন উৎসব, পিঠা উৎসব, পালা গান, ঘাটু গান, লালন গান, ভাটিয়ালি গান, পুতুল নাচ, বৃষ্টি না হলে ব্যাঙের বিয়ে ইত্যাদি কৃষিভিত্তিক পর্যটনে ভূমিকা রাখে।

জীবনযাত্রা পর্যটন: কৃষক, মাঝি, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমোর কীভাবে জীবন যাপন করে তা দেখার জন্য উৎসুক পর্যটকরা যাবেন।

এগ্রো ট্যুরিজম কেনো গুরুত্বপূর্ণ: দেশের কয়েক হাজার গ্রাম পর্যটন বান্ধব হলে, সামাজিক, ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধিত হবে। আধুনিক পর্যটনের উদ্দেশ্য হলো পর্যটনকে সাশ্রয়ী ও জীবনমুখী করা। পর্যটনের উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে জীবনের উৎকর্ষ সাধন করে মানুষের বিশ্রাম, বিনোদন শিক্ষার জায়গাকে নিশ্চিত করা সম্ভব। এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হলে, আমাদেরকে কৃত্রিম পর্যটন সেবার থেকে সরিয়ে এনে প্রাকৃতিক পর্যটন সেবার দিকে ধাবিত করতে হবে। আর এগ্রো ট্যুরিজম হচ্ছে সেই উপায়। পর্যটন ১০৯টি শিল্পকে সরাসরি প্রভাবিত করে, চালিত করে ও প্রসারিত করে। একজন পর্যটকের আগমনে সেবাখাতে প্রত্যক্ষভাবে ১১ জন ও পরোক্ষভাবে আরো ৩৩ জন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এগ্রো ট্যুরিজম এমন একটি খাত যেখানে একজন যুবক তার ফসল উৎপাদন ছাড়াও তার আবাসস্থল ও শস্যক্ষেতকে কৃষি পর্যটন বান্ধব করে সারাবছরের আয়ের উৎসে পরিণত করতে পারেন। ধরা যাক, বাংলাদেশে ২ কোটি কৃষক জনপ্রতি ন্যূনতম দুইহাজার টাকা পর্যটনের মাধ্যমে আয় করেন তাহলে এক সপ্তাহে আয় দাঁড়ায় চারহাজার কোটি টাকা, মাসিক আয় ঘোলহাজার কোটি টাকা, বছয়ে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এতেই বোঝা যায় এগ্রো ট্যুরিজম কীভাবে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশের এগ্রো ট্যুরিজম স্পট: কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, মসলা গবেষণা ইনস্টিটিউট, আম গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নয়নাভিরাম ক্যাম্পাস, জার্মপ্লাজম সেন্টার, জিন ব্যাংকসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও সর্বশেষ উদ্ভাবিত কৃষি কলাকৌশল ও জাতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। আমাদের দেশে ছড়িয়ে আছে ৪৫০-এর বেশি হাওড়-বাঁওড়, বিল-ঝিল, দিঘি-জলাশয়। এসব জলাশয়ে আধুনিক জলযানে ঘুরে বেড়ানো, পাঁখি দেখার ব্যবস্থা, মাছ ধরার সুবিধা, নৌকা বাইচের ব্যবস্থা, নৌকা চালানো এসব, মৌমাছি পালনকারীদের মধু সংগ্রহ দেখা ও টাটকা মধু খাওয়া ইত্যাদি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। ফল ধরার মৌসুমে ফুল ফোটা ও মুকুল ধরা দেখা, পাকা ফলের বাগানে ঘুরে বেড়ানো এমনকি মৌসুমের একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে বাগানে যত খুশি ফল খাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। রাজশাহীর গোদা গাড়ি উপজেলার পলাশবাড়ি গ্রামে গড়ে উঠা ড্রিমার্স গার্ডেন যেখানে ১৩ বিঘা জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির সাড়ে ৩০০ আম গাছ সঙ্গে ছয় বঙ্গের টিউলিপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, পিটুনিয়া সহ যোল প্রজাতির ফুল রয়েছে যা দেখতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাচ্ছে। এরকম আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ঠাকুরগাঁয়ের অরেঞ্জ ভ্যালি।

আমরা পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জায়গায় কৃষি পর্যটন গড়ে তুলতে পারি। যেমন: পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। গোপালগঞ্জ ও বরিশাল জেলার অববাহিকায় প্লাবনভূমিতে ভাসমান বাগানে কৃষি পর্যটন প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। ভাসমান বাগান টঘঙ-ঋঅঙ যাঁরা ২০১৬ সালে গ্লোবালি ইমপর্টেন্ট এগ্রিকালচার হেরিটেজ সিস্টেমস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সিলেটের জলাভূমি-রাতারগুল, খুলনার সুন্দরবন, পাহাড়ি কৃষি, চা বাগান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় হলুদে ভরপুর সরিষা জমি, দিনাজপুরের লিচু বাগান, যশোরের ফুলের বাগান, নরসিংদীর লটকন বাগান, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, রংপুরের আম বাগান সম্ভাব্য কৃষি পর্যটনের ভালো কিছু উদাহরণ। এছাড়াও ঐতিহ্যগতভাবে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে জুম চাষ, গ্রামীণ নারীদের উৎপাদিত ফসল, হাঁস মুরগির খামার, ঢেঁকিতে ধান ভাঙা এগুলোর প্রতি বিদেশি ট্যুরিস্টদের আগ্রহ অনেক বেশি এবং তারা উপভোগ করে।

এগ্রো ট্যুরিজম উন্নয়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ: কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতি কাঠামোতে কৃষি পর্যটন স্বীকৃত। জাতীয় কৃষি নীতিমালা ২০১৮ এবং জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা ২০২০ কৃষি পর্যটনকে উন্নত করার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। সরকার কৃষি বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি পর্যটনে কীভাবে কৃষকদের সম্পৃক্ত করা যায়, তাদের কৃষিভিত্তিক পর্যটনের উপর ট্রেনিং দিয়ে জাতীয়ভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে কৃষি পর্যটনকে জিডিপি আয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

এগ্রো ট্যুরিজমের একটি ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপস তৈরি করা যেতে পারে। কোন জায়গায় কি ভালো হয়, রাজশাহীকে কবে আম পারা শুরু হবে, বিল বা হাওরে কোনো দিন মাছ ধরার উৎসব হবে, কোনো মাসে বা সময়ে পদ্মায় ইলিশের ভরা মৌসুম থাকবে এসব তথ্য আগেই ওয়েবসাইটে আপলোড করা থাকবে। অন্যদিকে পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই এলাকায় কীভাবে কম খরচে স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ যাবে, কোথায় থাকার ব্যবস্থা আছে, ভাড়া কত ইত্যাদি তথ্যাদি ওয়েবসাইটে লিপিবদ্ধ করতে পারেন।

কৃষির প্রতি সম্মান ও কৃষির ঐতিহ্যকে নিজেদের মধ্যে লালন করতে কৃষি পর্যটন হতে পারে অন্যতম মাধ্যম। তাছাড়া কৃষি পর্যটনের মাধ্যমে টেকসই উৎপাদন করার সঙ্গে সঙ্গে বহুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, বিনির্মিত হবে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।” One village, one tourist destination এ স্লোগানটি কার্যকর করলে, কৃষিপ্রধান এদেশ অনেক এগিয়ে যাবে। তাই এগ্রো ট্যুরিজমের বিকাশ এখন সময়ের দাবি।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক কালের সমাজ, অর্থ সম্পাদক, গ্লোবাল এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন।

সর্বোচ্চ পঠিত - মতামত

Link copied!