শীতকাল অনেকের কাছে আরাম ও স্বস্তির ঋতু। ঠান্ডা আবহাওয়া, নরম রোদ, উৎসবের আমেজ—সব মিলিয়ে শীতকে অনেকেই উপভোগ করেন। কিন্তু এই একই শীত বহু নারীর জীবনে নিয়ে আসে এক ধরনের নীরব মানসিক অস্থিরতা। মন ভালো থাকে না, অকারণে মন খারাপ হয়, সবকিছুতে বিরক্তি আসে—এমন অভিজ্ঞতার কথা অনেক নারী শীত এলেই বলে থাকেন। বিষয়টি সাময়িক বলে মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যা নারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
প্রশ্ন হলো—শীতকালীন মেজাজের এই পরিবর্তন নারীদের কেন বেশি কষ্ট দেয়? এর পেছনে রয়েছে শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন, হরমোনজনিত প্রভাব, পুষ্টির ঘাটতি এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল সমন্বয়।
সূর্যালোক কমে গেলে মস্তিষ্কে কী ঘটে
শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য কমে যায় এবং সূর্যের আলো পাওয়া যায় সীমিত সময়ের জন্য। অথচ সূর্যালোক মানুষের মস্তিষ্কে সুখানুভূতির রাসায়নিক—সেরোটোনিন—তৈরি করতে সহায়তা করে। এই রাসায়নিক আমাদের মন ভালো রাখা, মানসিক স্থিরতা বজায় রাখা এবং দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শীতে আলো কমে গেলে সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায় এবং বিপরীতে ঘুমের হরমোন—মেলাটোনিন—বাড়তে থাকে। এর ফলে সারাক্ষণ ঝিমুনি, অলসতা, মনখারাপ ও উদাসীনতা তৈরি হয়। নারীদের মস্তিষ্ক এই পরিবর্তনের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল হওয়ায় তারা শীতকালে বেশি মানসিক অস্বস্তি অনুভব করেন।
ঋতুভিত্তিক বিষণ্নতা ও নারী
শীতকালে দেখা দেওয়া এই মানসিক অবসাদকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ঋতুভিত্তিক বিষণ্নতা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সমস্যায় আক্রান্তদের একটি বড় অংশ নারী। কিন্তু অধিকাংশ নারী এটিকে রোগ হিসেবে না দেখে “শীতের স্বাভাবিক মনখারাপ” ভেবে উপেক্ষা করেন।
এই অবস্থায় সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যায়—
* দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি * অল্পতেই মন খারাপ হয়ে যাওয়া * আগ্রহ ও আনন্দ কমে যাওয়া * মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া * অতিরিক্ত ঘুম এবং মিষ্টি খাবারের প্রতি ঝোঁক। চিকিৎসা ও মানসিক যত্ন ছাড়া এই অবস্থা ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতায় রূপ নিতে পারে।
হরমোনের ওঠানামা ও শীতকাল
নারীদের শরীর স্বভাবতই হরমোননির্ভর। মাসিক চক্র, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মের পরবর্তী সময় এবং ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর্যায়—প্রতিটি ধাপেই হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। শীতকাল এই ভারসাম্যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে যেসব নারীর—
* মাসিক-পূর্ব মানসিক ও শারীরিক সমস্যা আছে * থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা রয়েছে * ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার কাছাকাছি বয়স।তাদের ক্ষেত্রে শীতকালে মানসিক অস্থিরতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি: একটি নীরব কারণ
শীতকালে সূর্যের আলো কম পাওয়ার কারণে নারীদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি একটি সাধারণ সমস্যা। এই ভিটামিন শুধু হাড় শক্ত রাখার জন্য নয়, মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
ভিটামিন ডি-এর অভাবে—
* মনখারাপের প্রবণতা বাড়ে * বিষণ্নতা দেখা দেয় * উদ্বেগ ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়।দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক নারী এই ঘাটতির কথা জানতেই পারেন না এবং মানসিক সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে পান না।
সামাজিক ভূমিকা ও অদৃশ্য চাপ
শীতকালে নারীদের কাজ কমে যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়। শিশুদের সর্দি-কাশি, পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের যত্ন, শীতকালীন খাবার প্রস্তুত—সব দায়িত্ব নীরবে নারীদের ওপর এসে পড়ে।
এই সময় অনেক নারী—
* বাইরে কম বের হন * বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায় * এক ধরনের গৃহবন্দিত্ব অনুভব করেন।এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
শরীর নিয়ে অস্বস্তি ও আত্মসম্মান
শীতে নারীদের শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়—
ওজন বাড়ে, ত্বক শুষ্ক হয়, চুল পড়া বাড়ে। সমাজ যেহেতু নারীদের সৌন্দর্য ও শরীর নিয়ে বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি করে, তাই এসব পরিবর্তন তাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত হানে।নিজেকে ভালো না লাগার অনুভূতি ধীরে ধীরে মনখারাপ, হতাশা ও আত্মদোষারোপে রূপ নেয়, যা শীতকালে আরও প্রকট হয়।
পুষ্টির অভাব ও রক্তস্বল্পতা
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা একটি বড় স্বাস্থ্যসমস্যা। শীতকালে খাবারের অনিয়ম, পানি কম পান করা এবং শারীরিক চলাচল কমে যাওয়ার কারণে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়।
রক্তস্বল্পতা থাকলে— * মাথা ঝিমায়
* মনোযোগ কমে যায় * অল্পতেই বিরক্তি আসে।এই উপসর্গগুলো শীতকালীন মেজাজ পরিবর্তনকে আরও তীব্র করে তোলে।
কেন পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি কষ্ট পান
পুরুষরা সামাজিকভাবে বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ বেশি পান। কাজ, আড্ডা বা খেলাধুলার মাধ্যমে তারা মানসিক চাপ কিছুটা হলেও কমাতে পারেন। অনেক নারীর ক্ষেত্রে এই সুযোগ সীমিত।এ ছাড়া নারীরা আবেগকে ভেতরে চেপে রাখেন। শীতের নীরবতা সেই চেপে রাখা অনুভূতিকে আরও ভারী করে তোলে।
করণীয়: স্বাস্থ্য দৃষ্টিকোণ থেকে
শীতকালীন মেজাজের পরিবর্তনকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কিছু সহজ অভ্যাস মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে—
* প্রতিদিন কিছু সময় সূর্যের আলোয় থাকা * ভিটামিন ডি ও আয়রনের মাত্রা পরীক্ষা করা * নিয়মিত হাঁটা বা হালকা শরীরচর্চা * পর্যাপ্ত ঘুম ও পানি পান * নিজের অনুভূতি বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে ভাগ করা।প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মানসিক সুস্থতাও শারীরিক সুস্থতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলতে চাই,শীতকাল নারীদের জন্য শুধু একটি ঋতু নয়; অনেক সময় এটি একটি মানসিক চ্যালেঞ্জ। হরমোনজনিত পরিবর্তন, পুষ্টির ঘাটতি, সামাজিক চাপ ও একাকিত্ব—সব মিলিয়ে এই সময়ে নারীদের মন তুলনামূলকভাবে বেশি ভেঙে পড়ে। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করা এবং নারীদের মানসিক কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়াই একটি সুস্থ সমাজের প্রথম শর্ত।নারীদের মন ভালো থাকলে, শীতকালও উষ্ণ হয়ে ওঠে।
লেখক, কলাম,লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল, [email protected]



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

