প্রতিনিয়ত পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের কল্যাণ নিয়ে। বর্তমানে অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে ব্যাপক মন্দ ঋণ, যা প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ধরা যেতে পারে, আসল ঋণ ও সুদ সম্বলিত মোট ঋণের পরিমাণ বিগত দিনের তুলনায় বেশি। প্রতিনিয়ত এই সংবাদে গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে অনেক ব্যাংক আজ সমস্যাগ্রস্ত।
অর্থ পাচার, দুর্নীতি আর অনিয়মের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ ব্যতীত, ঋণ খেলাপি ব্যাংকিং কার্যক্রমে একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতি, যা সময়ের পরিক্রমায় পরিশোধ হয়ে যায়। যদিও ঋণ পরিশোধে মাত্রাতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ এবং অতিরিক্ত সুদ ও জরিমানা মন্দ ঋণের পরিমাণকে এক অসাভাবিক পরিস্থিতির অবতারণা ঘটায়। তাই পাচার ও নিয়মিত মন্দ ঋণ আলাদা করে সংবাদপত্রে প্রকাশ আমানতকারীর আস্থা সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ ও ব্যাংকিং খাত আমাদের সবার। দেশের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য এর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা এবং দেশের জনগণের কল্যাণে নিবেদিত থাকা।
বর্তমানে শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের তালিকা থেকে সাধারণ খেলাপিদের তালিকা আলাদা করে প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমাধান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সাধারণ নিয়মে ঋণের বিপরীতে বন্ধকী সম্পত্তি আছে বলে বিবেচিত হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ঋণে ৩০/৪০ শতাংশ কভারেজ দেওয়া থাকে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪০/৫০ শতাংশ ঋণ পরিশোধের যোগ্য।
আইন ও প্রথা অনুসারে, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক তাদের নিয়ম অনুযায়ী মন্দ ঋণগ্রহীতা ও গ্রাহকদের হতে ঋণ পরিশোধ করার প্রস্তাব দেবেন, অথবা তার ব্যতিক্রম হলে অর্থঋণ আইনে মামলা দায়ের করবেন। যা নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুদ বৃদ্ধি ও মোট ঋণ বৃদ্ধি করবে এবং পরবর্তীতে মন্দ ঋণের মাত্রা ৫ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। গ্রাহকের আস্থা কমবে বলে পত্রিকায় প্রচার হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আইন মন্ত্রণালয়, আইন কমিশন ও আদালত এই প্রচলিত নিয়মের সংস্কার অতি দ্রুত করবেন—এই আশা করছি।
অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য মন্দ ঋণ এক অভিশাপ। তাই প্রচলিত আইনের সংস্কার প্রয়োজন। যেকোনো ঋণ প্রভিশন পর্যায়ে যাওয়ার পর ও পুনঃতফসিল অতিবাহিত হওয়ার পর খেলাপি হলে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ও নির্ধারিত অন্যান্য কোম্পানির মাধ্যমে বন্ধককৃত সম্পত্তি বিক্রি করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করবে অথবা নির্ধারিত সময় শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত কোম্পানির মাধ্যমে বিক্রি করবে ও ঋণ পরিশোধ করবে। কিন্তু আইন মোতাবেক মামলা ও জরিমানা চলমান থাকবে, যা আইন ও নীতিমালা উভয় ক্ষেত্রেই কার্যকর থাকবে।
অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, অনেক ব্যাংক ঋণ খেলাপিদের সঙ্গে দুর্নীতি করে, যা পরিচালক ও ব্যাংকাররা সমর্থন করেন। আর তাই মাসের পর মাস এই মন্দ ঋণ চলতে থাকে।
নন-ব্যাংকিং অ্যাসেট, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির সঙ্গে যুক্ত, তা থাকলেও এই ঋণ মোচন সম্ভব। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমর্থন প্রয়োজন।
যেকোনো ব্যাংক এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে এবং যেকোনো কারণে সেই ব্যাংকের অবস্থান মজবুত করা সংবাদপত্র ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। কারণ গ্রাহকের আস্থা হারালে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন হয় এবং পরবর্তীতে ব্যাংকের আমানত কমে যায়, যার ফলে গ্রাহক টাকা উত্তোলন করতে পারেন না এবং সংবাদ প্রচারিত হয়।
সকলের উচিত এই সংস্কার সমর্থন করা ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। প্রতিটি ব্যাংক বাঁচার অধিকার রাখতে পারে, কারণ সে তার গ্রাহকের কাছে দায়বদ্ধ। দেশের সকল মানুষ কোনো না কোনো ব্যাংকের গ্রাহক। কর্মসংস্থান, কর থেকে দেশের আয় ও অর্থ সঞ্চালনে প্রতিটি ব্যাংক অংশগ্রহণ করে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।
আমার বিশ্বাস সরকার ও মাননীয় গভর্নর মহোদয় এই বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন। কারণ, “সবার উপরে আমাদের দেশ”
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

