AB Bank
  • ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

২০২৪ পরবর্তী ভারত-বাংলাদেশ স্বাস্থ্য পর্যটনের নতুন বাস্তবতা


Ekushey Sangbad
ড. হাসান মাহমুদ
০৪:৪০ পিএম, ১৮ মে, ২০২৬

২০২৪ পরবর্তী ভারত-বাংলাদেশ স্বাস্থ্য পর্যটনের নতুন বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে ভারত-বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিবছর লাখ লাখ বাংলাদেশি উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও ভিসা জটিলতার কারণে এই খাত হঠাৎ করেই বড় ধাক্কা খায়। এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ায় আবারও পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ স্বাস্থ্য পর্যটন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল চিকিৎসা নয়—এটি দুই দেশের মধ্যে “স্বাস্থ্য কূটনীতি” (Health Diplomacy)-এর অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।

বাংলাদেশ এখনো ভারতের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ট্যুরিজম মার্কেট।

ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮২ হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসা ভিসায় ভারতে গেছেন। যদিও ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ। অর্থাৎ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কিছুটা পতন হলেও বাংলাদেশ এখনো ভারতের সর্ববৃহৎ মেডিকেল ট্যুরিজম উৎস দেশ।

গত পাঁচ বছরে ভারতগামী বাংলাদেশি চিকিৎসা পর্যটকের সংখ্যা ছিল:

২০২০: ৯৯ হাজার

২০২১: ১ লাখ ৮৬ হাজার

২০২২: ৩ লাখ ২৬ হাজার

২০২৩: প্রায় ৫ লাখ

২০২৪: ৪ লাখ ৮২ হাজার (সূত্রঃ the daily star এবং Sain network)

এই পরিসংখ্যান দেখায় যে কোভিড-পরবর্তী সময়ে চিকিৎসা ভ্রমণের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে এবং সাময়িক রাজনৈতিক সংকট সত্ত্বেও সেই নির্ভরশীলতা এখনো বহাল রয়েছে।

ভারত, বাংলাদেশিদের প্রথম চিকিৎসার প্রথম গন্তব্যঃ

বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ভারত জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে:

১. কম খরচে বিশ্বমানের চিকিৎসা

যুক্তরাষ্ট্র বা সিঙ্গাপুরের তুলনায় ভারতে চিকিৎসা ব্যয় ৬০–৮০ শতাংশ পর্যন্ত কম। তবুও চিকিৎসার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের।

২. ভাষা ও সাংস্কৃতিক মিল

বাংলা ভাষাভাষী স্টাফ, খাবারের মিল এবং সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য রোগীদের মানসিক স্বস্তি দেয়।

৩.দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা

বাংলাদেশে জটিল রোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ অপেক্ষা থাকলেও ভারতে দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও সার্জারির সুযোগ রয়েছে।

৪. উন্নত বিশেষায়িত চিকিৎসা

ক্যান্সার, কার্ডিয়াক সার্জারি, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট, IVF, নিউরোসার্জারি ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনে ভারতীয় হাসপাতালগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব-

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে ২০২৪ সালে ভারতীয় হাসপাতালগুলোর আয়ে ৩০–৩৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রভাব পড়ে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। কারণ বাংলাদেশ থেকেই ভারতের মোট মেডিকেল ভিসার প্রায় ৭০–৭৫ শতাংশ ইস্যু হতো।

বিশেষ করে কলকাতার হাসপাতালগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

তবে ২০২৫ সালের শুরু থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়া, কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় হওয়া এবং রোগীদের নতুন করে আগ্রহ বাড়ার কারণে কলকাতা, চেন্নাই ও দিল্লির হাসপাতালগুলোতে আবারও বাংলাদেশি রোগীর চাপ বাড়ছে।

ভারতের অর্থনীতিতে বাংলাদেশি রোগীদের গুরুত্ব-

ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজম শিল্পের বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ৭.৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশি রোগীরা শুধু হাসপাতালেই অর্থ ব্যয় করেন না। তাদের মাধ্যমে উপকৃত হয়:

  • হোটেল শিল্প

  • এয়ারলাইনস

  • ট্রাভেল এজেন্সি

  • ডায়াগনস্টিক সেন্টার

  • ফার্মেসি

  • স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থা

বিশেষ করে কলকাতা শহরের অর্থনীতিতে বাংলাদেশি রোগীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক হাসপাতাল ও আশপাশের ব্যবসা এই রোগী নির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

নতুন প্রতিযোগিতা: ভারত বনাম চীন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া

রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সুযোগ নিয়ে চীন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশি রোগীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতীয় মেডিকেল ভিসা সীমিত হওয়ায় চীন নতুন করে স্বাস্থ্য সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এটি ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সতর্কবার্তা। কারণ স্বাস্থ্য পর্যটন কেবল অর্থনীতি নয়, এটি “সফট পাওয়ার”-এর অংশ। একজন রোগী চিকিৎসা নিতে গিয়ে যে দেশের মানবিকতা ও সেবার অভিজ্ঞতা পান, তা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের জন্য বার্তা;

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের সীমাবদ্ধতার একটি প্রতিফলন।

বাংলাদেশে এখনো যেসব ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে:

  • উন্নত ক্যান্সার কেয়ার

  • অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট

  • আন্তর্জাতিক মানের নার্সিং

  • আধুনিক ডায়াগনস্টিক অবকাঠামো

  • রোগী ব্যবস্থাপনা ও হাসপাতাল প্রশাসন

তবে ইতিবাচক বিষয় হলো, এখন অনেক ভারতীয় হাসপাতাল বাংলাদেশে প্রতিনিধি অফিস ও কনসালটেশন সেন্টার চালু করতে আগ্রহী। এর ফলে রোগীরা দেশে থেকেই প্রাথমিক পরামর্শ নিতে পারবেন। গ্লোবাল মেডি সল্যুশন এদের মধ্যে অন্যতম পরামর্শক যা গুলশানে অবস্থিত।

ভবিষ্যতের কৌশলগত সুযোগ;

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী পাঁচ বছরে ভারত-বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে যদি উভয় দেশ নিচের খাতগুলোতে গুরুত্ব দেয়:

  • যৌথ উদ্যোগ

  • বাংলাদেশে ভারতীয় হাসপাতালের সহযোগী সেন্টার

  • টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম

  • যৌথ মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ

  • ভিসা সহজীকরণ

  • ফাস্ট-ট্র্যাক মেডিকেল ভিসা

  • অনলাইন ভিসা প্রসেসিং

  • জরুরি রোগীদের জন্য বিশেষ করিডোর

  • স্বাস্থ্য বিনিয়োগ

  • যৌথ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল

  • ডায়াগনস্টিক নেটওয়ার্ক

  • নার্স ও টেকনিশিয়ান প্রশিক্ষণ

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারত-বাংলাদেশ স্বাস্থ্য পর্যটন খাতকে সাময়িকভাবে ধাক্কা দিলেও বাস্তবতা হলো—দুই দেশের স্বাস্থ্য নির্ভরতা এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। চিকিৎসা শুধু ব্যবসা নয়; এটি আস্থা, মানবিকতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।

যদি দুই দেশ কৌশলগতভাবে স্বাস্থ্য সহযোগিতা বাড়াতে পারে, তাহলে আগামী দশকে ভারত-বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজম দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সফল আঞ্চলিক স্বাস্থ্য অর্থনৈতিক মডেল হয়ে উঠতে পারে।

 

লেখক: স্বাস্থ্য বিষয়ক কুটনীতিক

Link copied!