AB Bank
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ, ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

অন্তত স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগটা দিন


Ekushey Sangbad
একুশে সংবাদ ডেস্ক
১১:১৩ এএম, ১৯ নভেম্বর, ২০২৩
অন্তত স্বাভাবিক মৃত্যুর সুযোগটা দিন

একবার অফিসের কাজে বেশ অভিজাত একটি রেস্টুরেন্টে কফি খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রায় কয়েকশ টাকার সেই কফি প্রথমে কিছুটা সুস্বাদু মনে হলেও, দাম শোনার পর তা বিস্বাদে বদলে গিয়েছিল। গরিবি মনে তখন একটাই খচখচানি – দামী কফির সেই স্বাদ কি আমার পরিচিত টং দোকানের চায়ের চেয়ে ভালো?

আমার মতো অনেক মানুষই আছেন, যাদের কাছে চা-কফির জন্য টং দোকানই ভরসা। ওই চা-কফিরই তো দাম বেড়ে নাভিশ্বাস অবস্থা। এর ওপরে ওঠা অনেক সাধারণের জন্যই কঠিন বিষয়। কম খরচে একটু চাঙা হওয়ার এটিই যে সহজ উপায়। অথচ সংবাদমাধ্যমের খবর পড়ে এখন প্রচণ্ড দ্বিধা মনে। চা খাচ্ছি, নাকি মলবাহিত জীবাণু?

তা না হয় টং দোকানের বা ফুটপাতের দোকানের চা শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া গেল। কিন্তু বাসা-বাড়ি? সরকারি গবেষণাই যে বলছে, রাজধানী ঢাকার বাসা-বাড়িতে মিলেছে মলবাহিত জীবাণু। বিশেষ করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরের বাসা-বাড়ির ৪০ ভাগ পানিতে পাওয়া গেছে এই জীবাণু। পানিতে ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা জানতে মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন বাসা-বাড়ি থেকে পানির ১৫০টি নমুনা সংগ্রহ করে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয় নমুনা। এরপর সেসব পরীক্ষা করে জানা যায় আতঙ্ক জাগানিয়া তথ্য।

রাজধানীর বাসা-বাড়ির পানিতে তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন গবেষকরা। এসব জীবাণু আসে মানুষের মল থেকে। ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস ও অ্যামিবিয়াসিস রোগের কারণ এসব ব্যাকটেরিয়া। যদিও নমুনা শুধু যাত্রাবাড়ী ও মিরপুরের, তবে অন্যান্য এলাকার অধিবাসীদের স্বস্তিতে থাকার খুব একটা কারণ নেই। কারণ অন্যান্য এলাকার নমুনা যে নেওয়াই হয়নি! ওসবেও যে মলবাহিত জীবাণু নেই, তা কি আর বুকে হাত দিয়ে দাবি করতে পারবেন?

কিছুদিন আগে একই ধরনের একটি খবর প্রকাশ করেছিল একটি জাতীয় দৈনিক। তাতে দাবি করা হয়েছিল যে, রাজধানীর পানির মান নিয়ে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটেরই এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা নগরীর ফুটপাতের চায়ের দোকানে ব্যবহৃত পানির ৯৪ শতাংশেই আছে মলবাহিত জীবাণু। মলবাহিত জীবাণু হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে হিসাবে ধরা হয়। এ ছাড়াও ৪৪ শতাংশ পানিতে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া এবং ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দুই সিটি করপোরেশন এলাকা থেকেই দৈবচয়নের ভিত্তিতে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করে এই ফলাফল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত চলেছিল ওই গবেষণা।

দুই গবেষণাতেই একটি বিষয় স্পষ্ট যে, চায়ের কাপ থেকে বাসা-বাড়ির জগ– সবখানেই মলবাহিত জীবাণুর দখলদারিত্ব সুনিশ্চিত হয়েছে। না জেনেই এসব দূষিত পানি পান করা ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করছি আমরা। এরপর অসুস্থ হচ্ছি। হয়তো অনেকের প্রাণও যাচ্ছে। কারণ বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এসব জীবাণু প্রাণঘাতী রোগের কারণ হতে পারে খুব সহজেই। যদিও সেসব নিয়ে এখনও কোনো গবেষণা বা জরিপ হয়নি। ফলে মলবাহিত জীবাণুর প্রভাব এরই মধ্যে কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে আমাদের স্বাস্থ্যের কতটা ক্ষতি ঘটাচ্ছে, তা আন্দাজ করাও যাচ্ছে না। সমস্যার স্বরূপ বুঝতে পারলেই তো প্রতিরোধে মানুষ সচেষ্ট হবে, নাকি?

মলবাহিত জীবাণু চায়ের কাপ থেকে বাসা-বাড়িতে পৌঁছে গেল কীভাবে? সাধারণ মানুষের জীবনাচরণ ও পরিচ্ছন্নতাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। তবে কেউ নিশ্চয়ই এতটা পাগল নন যে, খাওয়ার পানির পাত্র বা পানির ট্যাংক এতটাই নোংরা করে রাখবেন যাতে মলবাহিত জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে! কারণ পাগলেও নিজের ভালো চায়। অন্তত হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পথে হাঁটতে চায় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। স্বাধীনতার আগ থেকেই রাজধানীবাসীর পানি ও পয়োনিষ্কাশনের দায়িত্ব পালন করে আসছে ঢাকা ওয়াসা। তবে সংস্থাটির কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ছিল প্রায় সময়ই। এখনও মাঝে মাঝেই রাজধানীর কোনো কোনো অঞ্চলের এলাকাবাসীরা অস্বচ্ছ পানি বোতলে ভরে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। ফলে ওয়াসার কাজ নিয়ে সংশয় ভালোভাবেই বিদ্যমান। আমরা ব্যক্তিগতভাবেও তার সাক্ষী। সেটিকে আরও বাড়িয়ে দেয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণা। কারণ গবেষকদের ধারণা, যেসব এলাকায় পানিতে মলবাহিত জীবাণু পাওয়া গেছে, তার কারণ হতে পারে অন্য কোনো উৎস থেকে পানিতে এসব এসেছে। পানি আসার ব্যবস্থায় দূষণ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর পানি সরবরাহের ব্যবস্থা দেখভালের দায়িত্ব যেহেতু ঢাকা ওয়াসার, সুতরাং জিজ্ঞাসার প্রশ্নবাণ তাদের দিকে নিক্ষিপ্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক।

আমাদের প্রিয় রাজধানীতে এমনিতেই সমস্যার শেষ নেই। বেশি বৃষ্টি হলে এই শহর ভেসে যায় ভেনিসের মতো। রোদের দিনে থাকে ধুলার আস্তর। এই শহরের বাতাসও দূষিত, প্রায়ই জায়গা করে নেয় দূষণের আন্তর্জাতিক তালিকার সর্বোচ্চ সীমায়। কানের পর্দা ফাটাতে আছে বিকট হর্ন, আছে অসহ্য যানজট। এতকিছুর পরও এই শহরের শ্রান্ত বাসিন্দারা দিনশেষে বাসায় ফেরে একটু শান্তি পেতে। সেখানেও যদি এখন মলবাহিত জীবাণু হানা দেয়, তবে শান্তির মা তো একেবারেই মরে যাবে! আর জীবনে যদি শান্তিই না থাকে, তবে আর কীসের রোজগার, কীসের দিনযাপন!

এসব ভেবেও কি একটু অশান্তি জাগে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনে? সেই খানিক খচখচানিতেও যদি তারা একটু তৎপর হতেন, কী ভালোই না হতো! হয়তো তখন ঢাকা শহরের মানুষগুলো মলবাহিত জীবাণুতে নয়, বরং স্বাভাবিক মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকার সুযোগটা পেত।

লেখক:অর্ণব সান্যাল, উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
একুশে সংবাদ/এস কে 

Link copied!