AB Bank
  • ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬,

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. রাজধানী

সাংবাদিকেদের দমন-পীড়নে বাড়ছে উদ্বেগ-উদ্বকণ্ঠা


Ekushey Sangbad
এসআই শফিক
০১:২৮ পিএম, ৩ জুন, ২০২৬

সাংবাদিকেদের দমন-পীড়নে  বাড়ছে উদ্বেগ-উদ্বকণ্ঠা

বাংলাদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলার ঘটনায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অনেক সাংবাদিক দেশজুড়ে নানা ধরনের হুমকি, শারীরিক আক্রমণ এবং পেশা থেকে ছিটকে পড়ার মতো ঝুঁকিতে রয়েছেন। একইসঙ্গে মাঠপর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর সহিংস হামলা, মামলা-হয়রানি এবং গণমাধ্যম অফিসে ভাঙচুরের মতো ঘটনা বাংলাদেশে নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এককথায় বলতে গেলে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বহুমুখী হুমকি দেখা দিয়েছে যা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে দেশে বিদেশেও।

জানা গেছে, বাংলাদেশে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন, হামলা এবং ঢালাওভাবে হত্যার অভিযোগ ও মামলা দায়েরের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ সম্পাদক পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শত শত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন হত্যা মামলাসহ নানা হয়রানিমূলক অভিযোগ আনা হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে রাজনীতিবিদ, চরমপন্থী গোষ্ঠী ও ক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়ছেন কর্মীরা। অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে সাংবাদিকদের হাত ভেঙে ফেলা, পিটিয়ে জখম করা এবং এমনকি হত্যার মতো চরম ঘটনাও ঘটেছে। এতে সাংবাদিক নেতারা মনে করছেন, সমষ্টিগতভাবে বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আইনি চাপ, শারীরিক হামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতা-প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের সম্মিলিত প্রভাব ভীতি ও নীরবতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে। যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নিপীড়ন ও দমন-পীড়ন নিয়ে ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে) এবং ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (আরএসএফ)-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও জীবন রক্ষায় কার্যকর আইনি সুরক্ষা এবং স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ঘটনায় সাংবাদিক সমাজ একটি চরম ভীতিকর ও অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

কাজী সোহাগকে প্রাণনাশের হুমকি,ডিআরইউ’র গভীর উদ্বেগ: সর্বশেষ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) সাবেক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সম্পাদক ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র রিপোর্টার কাজী মুহাম্মদ আফিফুজ্জামান (কাজী সোহাগ)-কে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মঙ্গলবার ডিআরইউর কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে সভাপতি আবু সালেহ আকন এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এক যৌথ বিবৃতিতে এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এরআগে গত ৩০ মে সন্ধ্যায় রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। সম্প্রতি হাসপাতালটিতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শনের সময় তিনি হাসপাতালের একটি ভবনে অবৈধ বিস্কুট কারখানা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্টাফ নার্সদের সাংবাদিকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে তারা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করেন। এতে কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। হামলার শিকার হওয়াদের মধ্যে টাইমস অফ বাংলাদেশ স্টাফ রির্পোটার কাজী জাহিদ, দীপ্ত টিভির ক্যামেরাপারসন আহত, বৈশাখী টিভির ক্যামেরা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

গত ২২ মে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাভারের পশ্চিম রাজাশন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল এসএ টিভির স্থানীয় প্রতিনিধিসহ দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তাইফুর রহমান তুহিন, ক্যামেরাপারসন মনিরুল কাইয়ুমসহ দেশ টিভির প্রাইভেটকার চালক জয়নাল। হামলাকারীরা তাদের দেশি অস্ত্র, লাঠিসোঁটা দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধরের পাশাপাশি এসএ টিভির স্থানীয় প্রতিনিধি সাদ্দাম ও দেশ টিভির সিনিয়র রিপোর্টার তুহিনকে ছুরিকাঘাত করে। এই হামলার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ী শামীম রেজার (৩৫) সঙ্গে সখ্যতা ও যোগাযোগ রক্ষার অভিযোগে সাভার মডেল থানা পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইননসে সংযুক্ত করা হয়। তবে দেশজুড়ে সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিভাগ সাংবাদিক ফোরাম ও বাংলাদেশ সেন্ট্রাল প্রেসক্লাব। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সকল মহলের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

মে মাসে হামলা-মামলা ও হুমকির শিকার অর্ধশতাধিক সংবাদকর্মী: চলতি বছরের মে মাসে দেশে ৫৫ জন সংবাদমাধ্যমকর্মী শারীরিকভাবে হামলা, নির্যাতন, আইনি হয়রানি এবং জীবননাশসহ নানা হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টের (বিএজে) গবেষণা ও মনিটরিং সেলের সম্পাদক মাহমুদুল হাছান। তিনি বলেন, মে মাসে সারা দেশে অন্তত ২১টি ঘটনায় ৩৮ সংবাদকর্মী শারীরিক হামলা, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এসব হামলার ঘটনা ঘটিয়েছেন মাদক ব্যবসায়ী, কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক দলের উশৃঙ্খল নেতাকর্মী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পেশাজীবীরা, ঠিকাদার এবং হাসপাতালকর্মীরা।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা,গভীর উদ্বেগ কিউআরএস: কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম (কিউআরএস) বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস)-এর সহায়তায় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ভয়েস কর্তৃক নথিভুক্ত সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অধিকার লঙ্ঘনের ৩৪টি ঘটনার রেকর্ড করা হয়েছে, যা সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আইনি হয়রানি এবং তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টির একটি উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। এসব ঘটনা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বগুড়ায় সাংবাদিক শুভ কুন্ডু, সঞ্জীব কুমার এবং সাজ্জাদ হোসেন পল্লবকে একটি রাজনৈতিক মামলায় শতাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আসামি করা হয়েছে, যা মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য ভীতিকর। এই ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারও উদ্বেগজনক। রংপুরে স্থানীয় সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিক ফেরদৌস জয়, মেহেদী হাসান, সাইফুল ইসলাম মুকুল এবং মাহবুব হোসেন সুমনের ওপর হামলার ঘটনা সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তার অভাবকে ব্যাপকভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

একইভাবে, লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিক তারেক মাহমুদ গণপিটুনির শিকার হন। চকরিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের তথ্যচিত্র ধারণকালে সাংবাদিক ছোটন কান্তি নাথ, ইকবাল ফারুক এবং এম. জিয়াবুল হকের ওপর হামলা করা হয়। এ সময় তাদের সরঞ্জাম জব্দ ও ভাঙচুর করা হয়, যা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। একইসঙ্গে সমালোচনামূলক খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ টাইমস-এর ২১ জন সাংবাদিককে আটক করার ঘটনা ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে, কুমিল্লায় সাংবাদিক রাসেল সরকার ও আব্দুল আলিমকে আটক এবং তাদের ধারণকৃত তথ্যচিত্র মুছে ফেলতে বাধ্য করার অভিযোগ প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সাতক্ষীরায় অবৈধ বালু উত্তোলন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক সামিউল মনিরের ওপর হামলার ঘটনা প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসএ টিভির সাংবাদিক হাসান আল সাকিব, ঢাকায় সাংবাদিক প্রসূন আশিস ও আমিনুর রহমানের ওপর প্রকাশ্যে হামলা ড. ইউনূসের আমলে নির্যাতনের শিকার ৪৯৬ সাংবাদিক: ২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের হলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর পর থেকেই শুরু হয় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও নির্যাতন। এ সময়ে চারজন সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মগোপনে রয়েছেন অনেকেই। তবে দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জানিয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২৬৬ জনকে অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা বা সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে। গত বছরের ৪ আগস্ট এ তথ্য প্রকাশ করে সংস্থাটি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশে ৩৮৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া চার সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা হয়েছে। আসক বলছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি সাংবাদিকদের কমবেশি নির্যাতন বা হয়রানি করেছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জাতীয় পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বার্তাপ্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক-উপস্থাপক ফারজানা রুপাকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ফজলুল করিম নামের একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ছাড়া রাজধানীর আদাবরে পোশাকশ্রমিক রুবেল হত্যা মামলাতেও তাদের দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে তারা কারাগারে আছেন, এখনো জামিন পাননি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে আটক হন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হওয়া কয়েকটি হত্যা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি এবং জনতা পার্টি বাংলাদেশের মহাসচিব শওকত মাহমুদ গ্রেপ্তার হন। তিনি বর্তমানে কারাগারে। গত বছরের এপ্রিলে ‘জনতা পার্টি বাংলাদেশ’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হয়। দলটির চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় গত বছরের আগস্টে মাইটিভির চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক যুবককে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এসব সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়ে মাসের পর মাস কারাগারে বিনা বিচারে কারাবন্দি রয়েছেন। বারবার জামিনের জন্য আবেদন করলেও সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে।

সাংবাদিকদেরই অনেকে বলছেন, সাংবাদিকেরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন। তাদের লেখালেখি বা বক্তব্যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে তার আইনি প্রতিকার রয়েছে। এমনকি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। কিন্তু ঢালাওভাবে হত্যা মামলার মতো গুরুতর অভিযোগে নাম ধরে ধরে আসামি করা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এ বিষয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন,আমরা যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তাহলে বিনা বিচারে কাউকে আটকে রাখা এবং দিনের পর দিন জামিন না দেওয়া সমীচীন নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। আমরা নোয়াবের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি বলেছি। শিগগিরই বিষয়টির সুরাহা হবে বলে আশা রাখছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের প্রধান ফটকের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন। সেখান থেকেই তিনি লাইভ সম্প্রচার করেন।

অন্য টেলিভিশনেও সেই সম্প্রচারের দৃশ্য দেখা গেছে, যার তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। কিন্তু একই দিন বিকেলে মিরপুরের ভাষানটেক এলাকায় এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁকেও আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে একাত্তর টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ শারমীন এসব তথ্য উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁর প্রশ্ন, একই ব্যক্তি একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকেন কীভাবে? এখন বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। শাহনাজ শারমীনের ঘটনাটিই একমাত্র ঘটনা নয়। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগে করা বিভিন্ন মামলায় সাংবাদিকদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছিল। বিভিন্ন পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল।

এর মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ সাংবাদিক এখনো মামলার বোঝা বহন করছেন এবং কারাবন্দীদের অনেকেই জামিন পাচ্ছেন না। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৪ মার্চ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি ব্যায়ামাগার থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ জামাল হোসাইন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। গত বছরের আগস্টে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান নিয়ে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে গিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম (পান্না)। মাস তিনেক পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৮ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এসব ঘটনায় অন্যদের মধ্যেও কিছুটা আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই, মামলাগুলোর দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের ক্ষেত্রে আদালত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেবেন। এর আগে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের জামিন পাওয়ারও প্রত্যাশা করছেন তারা।

তবে কারাবন্দি সাংবাদিকদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো সংবেদনশীল। প্রতিটি মামলা যাচাই-বাছাই করে দেখছে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে দায় পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করছেন। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে।

 

একুশে সংবাদ/এ.জে

Link copied!