গ্রামীণ আঁধার রাতে জোনাকির আলো ছিল আমাদের শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ জ্বলে উঠত ঝিকিমিকি আলো, চারপাশের প্রকৃতি যেন এক ভিন্ন রূপে সেজে উঠত। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হতো জোনাকির পেছনে ছুটে চলা—হাতে ধরে রাখা, আবার ছেড়ে দেওয়া। কখনো কৌতূহলবশত উল্টে-পাল্টে দেখা হতো কীভাবে জোনাকির শরীরে এত সুন্দর আলো জ্বলে ওঠে।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে গাছগাছালি, লতাপাতা আর ঝোপঝাড়ের ফাঁকে তারার মতো মিটমিটে আলো জ্বালিয়ে রাতের নিরবতাকে মোহনীয় করে তুলত জোনাকি। তবে আধুনিক জীবনে এসেছে নানা ধরনের কৃত্রিম আলোর ব্যবহার। ফলে সেই প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে জোনাকির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এখন গ্রামগঞ্জে আগের মতো জোনাকির দেখা আর তেমন মেলে না।

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলায় কয়েক বছর আগেও গ্রামাঞ্চলে জোনাকির উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যা নামার পরই এসব জোনাকি নিজের আলোয় জ্বলে উঠত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই উপজেলায় আলোর বাহক নিশাচর জোনাকির দেখা খুবই কমে গেছে। তারা যেন দিন দিন নিজেদের আলো নিভিয়ে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা গেছে, জোনাকি মূলত বিটল শ্রেণির একটি পোকা, যাকে ইংরেজিতে লাইটনিং বাগ বা ফায়ারফ্লাই বলা হয়। ছোট্ট কালচে-বাদামি রঙের এই পোকা লম্বাটে গড়নের হয়ে থাকে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় দুই সেন্টিমিটার। এর ছয়টি পা, দুটি অ্যান্টেনা, অক্ষিগোলক এবং শরীর তিন ভাগে বিভক্ত। পেটের শেষ অংশে থাকে আলো উৎপাদনকারী অংশ। পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির জোনাকি পোকা রয়েছে। জলচর কিছু প্রাণীর আলো জ্বালানোর ক্ষমতা থাকলেও স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে জোনাকিই একমাত্র আলো জ্বালাতে সক্ষম।

দিনের বেলায় জোনাকিরা সাধারণত পুকুর, ডোবা, খাল-বিল ও নদীর তীরবর্তী লতা-ঘাস ও ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকে। এরা ক্ষুদ্রাকারের পোকা, যারা কেঁচো, শামুকের ডিম, পচা প্রাণী ও আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক জোনাকিরা ফুল ও ফলের মধু এবং রসও গ্রহণ করে।
ধনবাড়ী উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল ইসলাম মিলন বলেন, “শিশুকালে জোনাকি নিয়ে খেলা করেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে, বিশেষ করে যারা গ্রামে বড় হয়েছে। তখন গ্রামাঞ্চলে ঝোপঝাড় ও বাঁশবাগানের বিস্তৃতি ছিল, তাই জোনাকির উপস্থিতিও বেশি ছিল। বর্তমানে ঝোপঝাড় ও বাঁশবাগান কমে গেছে, বেড়েছে ঘনবসতি। এর পাশাপাশি কৃত্রিম আলোর ব্যবহার জোনাকির বিলুপ্তির অন্যতম কারণ। জোনাকি তীব্র আলো সহ্য করতে পারে না। এছাড়া প্রকৃতির ওপর মানুষের অব্যাহত প্রভাব জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বনায়ন বাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”
একুশে সংবাদ/ এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

