ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

এলএসডি কতটা ভয়াবহ মাদক, জানলে শিউরে উঠবেন!


Ekushey Sangbad
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৩:২৫ পিএম, ৩১ মে, ২০২১
এলএসডি কতটা ভয়াবহ মাদক, জানলে শিউরে উঠবেন!

বর্তমানে ভয়াবহ এক মাদক এলএসডির খোঁজ পেয়েছেন পুলিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে বেড়িয়ে আসে এই আত্মঘাতী মাদকের সন্ধান।এই মাদক ব্যবহারের পর সেবনকারীরা নিজেকে হত্যার চেষ্টা করতে থাকেন। হাফিজুর রহমানের মৃত্যুও এ কারণেই ঘটেছে। নিজের গলায় দা চালিয়ে আত্মহত্যা করা হাফিজুর এই মাদকেই আসক্ত ছিলেন। 

উল্লেখ্য ঢাবি ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজতে নেমে ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রকে গ্রেফতার করে ডিবি। এরপর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেড়িয়ে আসে ভয়ংকর মাদক এলএসডির তথ্য। জানা গেছে, বিদেশ থেকে এই মাদক দেশে আনা হচ্ছে। অনেক ব্যয়বহুল এই মাদক উচ্চবিত্তদের মাঝে বেশি ছড়িয়ে পড়ছে।

এলএসডি মাদক অনেক পুরোনো হলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার নতুন। কিন্তু খুব দ্রুত বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এটি।

                       

এলএসডি কী?
এলএসডির অর্থ হলো, লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড। এই অ্যাসিড এক ধরনের সাইকেডেলিক ওষুধ, যা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের জন্য পরিচিত। এটি প্রধাণত প্রমোদমূলক ওষুধ হিসেবে এবং আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য ব্যবহৃত হয়। এলএসডি সাধারণত জিভের নিচে রেখে ব্যবহার করা হয়। এই অ্যাসিড প্রায়ই বল্টার কাগজ, চিনির কিউব, বা জিলেটিনে বিক্রি করা হয়। এটি ইনজেকশনের সাহায্যেও নেয়া হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, ডি-লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ। যা রাই এবং বিভিন্ন ধরনের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়।

বর্ণনা:

এলএসডি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। এলএসডিকে সাইকাডেলিক মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরনের মাদকের প্রভাবে মানুষের মতিভ্রম ঘটে। আশেপাশের পরিবেশ ও বাস্তবতাকে মুহূর্তেই ভুলে গিয়ে অলীক বস্তু প্রত্যক্ষ করতে থাকেন।

                          

এলএসডি সেবনে মস্তিষ্কে প্রভাব:

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের গবেষণা অনুসারে, এই মাদকটি মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রম প্রভাবিত করে। এ কারণে মাদক ব্যবহারকারীর ব্যবহার, অনুভূতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তন করে।

এলএসডি নেয়ার পর সাধারণত মানুষ ‘হ্যালুসিনেট’ করে বা এমন দৃশ্য দেখে যা বাস্তবে নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ। অনেকেই এই মাদক ব্যবহারের পর ভালো অনুভূতি বোধ করেন। আবার অনেকেই উন্মাদ হয়ে ভয়ঙ্কর কিছু পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়েই বিপদগ্রস্ত হয়ে থাকেন।এলএসডি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবৈধ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থা বেকলি ফাউন্ডেশন সম্প্রতি এলএসডির উপর গবেষণা করেছে। এই গবেষণার প্রধান গবেষক ডেভিড নাট এই গবেষণাকে পার্টিকেল ফিজিক্সে হিগস বোসনের আবিষ্কারের সমতুল্য বলে আখ্যা দিয়েছেন।

শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ২০ জন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু হয়। দু’দিন তাদের ওপর ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ও ট্যাবলেট আকারে ৭৫ মাইক্রোগ্রাম এলএসডি প্রয়োগ করা হয়। এরপর বিভিন্ন পদ্ধতিতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ও মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তের চলাচল পরীক্ষা করা হয় ও ছবি তোলা হয়। এই মাদক গ্রহণ করার আগে ও পরে সেবনকারীর মস্তিষ্কের ছবি তুলে পার্থক্য বের করা হয়।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এলএসডি গ্রহণের পর সেবকারী চোখ বন্ধ করেও অলীক সব দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পায়। তখন সে বাস্তব এবং কল্পনার জগতের মধ্যে মিল খুঁজে পায় না। তারা এসব দৃশ্য সবসময় বাইরের পৃথিবী বা স্মৃতি থেকে আসে না। কল্পনাশক্তির সাহায্যে তারা এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পায়।

 

                

গবেষণা থেকে জানা যায়, এলএসডি গ্রহণের পর মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। একইসঙ্গে এলএসডির প্রভাবে মস্তিষ্কের বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যাবস্থা দূর্বল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা জানান, এলএসডি ব্যবহারকারীরা যে কল্পনাজগত চোখের সামনে দেখতে পান, সেসব মস্তিষ্কে জমে থাকা তথ্যভাণ্ডার থেকে আসে। সেসব তথ্য সবসময় মস্তিষ্কের পেছন দিকে অবস্থিত ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স থেকে আসে না।

অর্থাৎ মানুষের দৃশ্যমান স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে না। এই মাদকের প্রভাবে মস্তিষ্কের কাজ করার ভিন্ন ভিন্ন অংশ মিলেমিশে যায়। মস্তিষ্কের ছবি থেকে আরও জানা গেছে, একই সঙ্গে এলএসডি সেবনে কারণে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা ভেঙে যায় এবং পৃথকভাবে কাজ করতে থাকে। ফলে ব্যবহারকারী পৃথিবীতে শুধু নিজেকেই দেখতে পান এবং একক সম্পর্ক অনুভব করেন, যাকে বলা হয় ইগো ডিসোল্যুশন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এর সমীক্ষা অনুসারে, এলএসডি গ্রহণের ফলে মানুষের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ ছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ঘামসহ নানা ধরণের মানসিক সমস্যাও তৈরি হয়।

এলএসডি গ্রহণ করে ভুল রাস্তা দেখে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, বাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বা অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনা অনেক ঘটেছে বলে জানা যায়। এ ছাড়াও বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা ব্যক্তিরা এলএসডি গ্রহণের পর আরো বেশি বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হতে পারেন বলেও উঠে এসেছে অনেক গবেষণায়।

ইউরোপের বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের বাণিজ্যিক ওয়েবসাইট রিসার্চগেইট'এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় মোট ৬৪ জনের মৃত্যু হয় এলএসডি গ্রহণের পরবর্তী জটিলতায়।

একুশে সংবাদ/তাশা