ঢাকা সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

সুগন্ধি বকুল ফুলের গুনাগুন


Ekushey Sangbad
একুশে সংবাদ ডেস্ক
০৫:৩৯ পিএম, ৩ আগস্ট, ২০২১
সুগন্ধি বকুল ফুলের গুনাগুন

বকুল ফুল অনেকেরি খুব পছন্দের একটি ফুল । তার কারন বকুল ফুল দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি এর সুগন্ধে মাতিয়ে রাখে অনেক দিন । এর সুগন্ধের কারনে এ ফুলের মালা বানিয়ে ঘরে রেখে দেই অনেকেই । তবে বকুল শুধু দেখতে সুন্দর আর সুগন্ধি ফুল হিসেবেই পরিচিত নয়, এর রয়েছে অনেক রকম আয়ুর্বেদিক ও ঔষধি গুণ। শুকনো বকুল ফুলের গুড়া নাক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিলে মাথা ব্যাথা কমাতে সাহায্য করে।বকুল ফুলের রস হৃদযন্ত্রের অসুখ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়।

বকুল ফুল আমাদের অতি পরিচিত একটি ফুল, এই ফুলের বিচরণ কমবেশি সব জায়গাতেই দেখা যায়। এর অদ্ভুত পাগল করা সৌরভ যে কারো মন কেড়ে নিবে। এর সৌরভ শুধু মনই মাতায় না, একে নিয়ে গান-কবিতারও শেষ নেই। তাই তো “জলের গান” ব্যান্ডের একটি জনপ্রিয় গান আছে এই ফুলটিকে নিয়ে- “বকুল ফুল বকুল ফুল সোনা দিয়া হাত কেনে বান্ধায়লি” আমাদের দেশের অতি পরিচিত বকুল ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Mimusops elengi। এটি মিনাসপ্স্‌ (Minasops) প্রজাতির একটি ফুল। বকুল ফুলের গাছ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী এলাকার ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, বার্মা, ইন্দো-চীন, থাইল্যান্ড, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ এলাকা জুড়ে দেখতে পাওয়া যায়। আর অন্য দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, নিউ ক্যালিডোনিয়া (ফ্রান্স), ভানুয়াটু, এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়াতে এই গাছ চাষ করা হয়।

বহুনামের বহুরূপী-
আমাদের দেশে বকুল ফুলকে অঞ্চলভিত্তিক অনেক নামেই ডাকা হয় যেমন বকুল, বহুল, বুকাল, বাকুল, বাকাল। তবে বকুল নামেই এই ফুলটি বেশি পরিচিত। সংস্কৃততে এই ফুলের নাম আনাঙ্গাকা, ছিড়াপুস্প, কিরাপুস্প, ধানভি দোহালা, কন্ঠা, কারুকা, মধুগন্ধামদন ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। প্রচলিত ইংরেজি নামের মধ্যে সাধারণত এই ফুলটিকে স্পেনিজ চেরি, মেডলার ও বুলেট উড বলা হয় । মনিপুরীরা বলে বোকুল লৈ। মায়ানমারে খুব সুন্দর একটা নামে এই ফুলকে ডাকা হয়- কায়া । এরকম আরও অনেক দেশে এই ফুলের অনেক নাম আছে যেমন মালয়েশিয়াতে বলে মেংকুলা, বাকুলাম , ইলাঙ্গি; ইন্দোনেশিয়াতে তাঞ্জাং , কারিকিশ ও থাইল্যান্ডে - কুন (Kun), কাইও (Kaeo) ইত্যাদি কতই না নাম এই বকুল ফুলের

বকুল গাছ-
বকুল গাছ খুব বেশি বড় বা ছোট হয়না কখনোই, এটি মাঝারি আকারের ১৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বকুল ফুলের গাছকে চিরহরিৎ বৃক্ষ বলা হয় কারণ এই গাছ কখনোই পাতাশূন্য হয় না। এর পাতা গাঢ় সবুজ উপবৃত্তাকার, মসৃণ, গাড় সবুজ ও ঢেউ খেলানো, আকারে ৫ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ২.৫ থেকে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়।

বকুল ফুল-
বকুল ফুল কিন্তু আকারে খুব ছোট ছোট হয়, বড় জোড় ১ সেঃ মিঃ। এই ফুলের রঙটি ঠিক সাদা নয়, ঘিয়ে রঙা মানে হলুদাভ সাদা বা ক্রীম রঙের হয়। । আর সবচেয়ে বিশেষ যেই ব্যাপারটি রয়েছে এই ফুলের মধ্যে তা হলো, বকুল ফুল দেখতে অনেকটা তারার মতো, মনে হয় যেনো গাছের মধ্যে তারা ফুটে আছে। এই ফুলটিকে গ্রীষ্মকালীন ফুল বলা হলেও আসলে বকুল ফুল বসন্তের শুরু থেকে ফোটা শুরু করে আর থাকে অনেকদিন পর্যন্ত একেবারে পুরো শীতকাল জুড়ে। এই ফুলের এক থোকায় এক থেকে ছয়টি ফুল ফোটে। বকুল ফুল প্রতিদিন গাছ ঝেঁকে ফোটে, একসাথে এতো বেশি ফোটে যে ফুলের জন্য পাতা দেখা যায় না। কিন্তু হলে কি হবে, ফুল থাকলে তো! বকুল ফুল আবার খুব সহজেই ঝরে যায়। ছোট তারার মত এই ফুলটি ফোটে রাতে আর এবং সারাদিন ধরে টুপটাপ ঝরে পরতে থাকে। এই ঝরা বকুল ফুল নিয়ে ময়মনসিংহ গীতিকায় চমৎকার একটি গান লেখা রয়েছে- “গাঁথ গাঁথ সুন্দরী কন্যা লো মালতীর মালা ঝইরা পড়ছে সোনার বকুল গো ঐ না গাছের তলা।“

বকুল ফল-
অনেক তো ফুল নিয়ে কথা হলো এবার এর ফলের সৌন্দর্য নিয়েও বলা যাক! বকুল গাছে যখন ফল হয় তখন তা ছোট ছোট কুল বা বড়ইয়ের মত ডিম্বাকৃতির ফল হয় । ফলগুলো কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকে আর পাঁকলে তা লাল বর্ণ ধারণ করে। রং পরিবর্তনের পর অদ্ভুত সুন্দর লাগে একে দেখতে। পাখিরাও তাই আকৃষ্ট হয়ে বকুল ফল খেতে আসে। শুধু পাখিরাই না, বাচ্চাদের ও বকুল ফল খেতে দেখা যায়। মালয়'রা বকুল ফল সংরক্ষণ করে রাখে এবং আচার তৈরি করে। এই ফলের স্বাদ একটু কষযুক্ত হালকা মিষ্টি। গাছে এই ফল আসবে বর্ষাকালে মানে ঠিক আর কয়দিন পরই। চাইলে আপনিও খেয়ে দেখতে পারেন, স্বাদটা নিছক মন্দ নয়।

বকুলের আয়ুর্বেদিক ও ঔষধি গুণ-
- বকুল ফুলের রস হৃদযন্ত্রের অসুখ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও শুকনা ফুলের গুড়া দিয়ে তৈরী ঔষধ "আহওয়া" নামক এক ধরনের কঠিন জ্বর, মাথা ব্যাথা এবং ঘার, কাঁধ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে সৃষ্ট ব্যাথার নিরাময়ে ব্যবহার হয়। শুকনা ফুলের গুড়া মাথা ঠান্ডা রাখতে ও মেধা বাড়াতেও উপকারী।
- শুকনো বকুল ফুলের গুড়া নাক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিলে মাথা ব্যাথা কমাতে সাহায্য করে।
- কাটা ছেঁড়ার ক্ষেত্রেও বকুলের ব্যবহার রয়েছে। বকুল গাছের ছাল দিয়ে কাটা ছেঁড়ার ক্ষত পরিষ্কার করা যায়। এছাড়াও বকুল গাছের ছাল ও তেঁতুল গাছের ছাল সিদ্ধ করে পাচনের মাধ্যমে তৈরি তরল ঔষধ ত্বকের নানারকম রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়।
- শুধু তাই নয় বকুলের পাতা সাপের কামড়ে খুবই উপকারী। এছাড়াও বকুলের পাতা সিদ্ধ করে মাথায় দিলে মাথা ব্যাথা কমে যায়। পাতার রস চোখের জন্যেও উপকারী।
- বকুলের পাকা ফলের খোসা পুরনো আমাশয়, কোষ্ঠকাঠিন্য উপশমকারী।
- বকুলের বীজও কাজে লাগে। এটি শক্তিবর্ধক, আর বকুলের ছাল দাঁতের মাড়ির রোগে ব্যবহৃত হয়।
- বকুলের কান্ডটাই বা বাদ যাবে কেনো, বকুলের গাছের কাণ্ড থেকে পাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক ধরনের ঔষধ তৈরি 
করা যা দাঁতের সমস্যা নিরাময়ে অনেক উপকারী। 

এছাড়াও এই ঔষধ জ্বর ও ডায়রিয়া থেকে আরোগ্য লাভের জন্যে ব্যবহার করা হয় এবং মুখ ধোয়ার তরল প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে এই তরল ঔষধ যা মাড়ি শক্ত করে।
বকুলের আগা থেকে গোড়া, ফুল থেকে ফল পর্যন্ত কোনো অংশই ফেলনা নয়। সবকিছুরই বিশেষ ব্যবহার ও গুণ রয়েছে।

অন্যান্য ব্যবহার
ফুল - ভারতে এই ফুল দিয়ে তৈরি তরল, সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহারে প্রচলন রয়েছে।
ফুল দিয়ে মালা গাঁথার প্রচলন অনেক পুরনো দিন থেকে চলে আসছে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীরা এই ফুলের মালা চুলে পরে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে।
ফল - পাকা ফল খাওয়া যায়। মালয়'রা বকুল ফল সংরক্ষণ করে রাখে এবং আচার তৈরি করে।[৯]
কান্ড - অনেক এলাকায় বকুল গাছের কাণ্ড বা নরম ডাল দাঁত মাজার জন্যে ব্যবহার করা হয়। [১০]
কাঠ - বকুল কাঠ অনেক দামি আর দুষ্প্রাপ্য কাঠ। এর কাঠ অনেক শক্ত, কঠিন হয় কিন্তু খুব সহজে কাটা যায় আর খুব সুন্দর পালিশ করা যায়. এই কাঠের রঙ গাঢ় লাল। এই কাঠ ঘর-বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।

এছাড়া আরও অনেক কিছুতে এই ফুল ফল ও কাঠ ব্যবহার হয়ে থাকে । তাইএ ফুলের উপকারিতার শেষ নেই ।

একুশে সংবাদ/বর্না