মানুষ স্বভাবতই ভুল করে। কখনো অজ্ঞতাবশত, কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় সে গুনাহে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহর অবাধ্যতার পথে পা বাড়ায়। এটাই মানবজীবনের বাস্তবতা।
তবে ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো-কোনো বান্দা গুনাহে জড়িয়ে পড়লেও তার জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় না। যতদিন জীবন রয়েছে, ততদিন রয়েছে তওবার সুযোগ, ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ এবং নিজেকে সংশোধন করে নতুনভাবে পথচলা শুরু করার সুযোগ।
অনেকেই অতীতের পাপের বোঝা বয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হন। তারা মনে করেন, তাদের জন্য ক্ষমার সব দরজা বুঝি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
অথচ কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের আশ্বস্ত করে যে, কোনো বান্দা যদি আন্তরিক অনুতাপের সঙ্গে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে মহান আল্লাহ শুধু তার গুনাহ ক্ষমাই করেন না; বরং তাঁকে নিজের অসীম রহমত ও অনুগ্রহে আচ্ছাদিত করেন। তাই গুনাহের কারণে নিরাশ না হয়ে তওবার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রচেষ্টাই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের ভালোবাসেন
ভুল ও গুনাহ মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। তবে সেই ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পুনরায় সৎপথে ফিরে আসাই প্রকৃত ঈমানদারের বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন—।
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
‘তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তার বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের সদকা গ্রহণ করেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ১০৪)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, আল্লাহ তাআলা তার বান্দার আন্তরিক অনুতাপকে ভালোবাসেন এবং ক্ষমা করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।
কোনো গুনাহই আল্লাহর রহমতের চেয়ে বড় নয়
অনেক মানুষ মনে করে, তার পাপ এত বেশি যে আল্লাহ হয়তো তাকে আর ক্ষমা করবেন না। কিন্তু এই ধারণা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা আজ-জুমার: আয়াত ৫৩)
এ আয়াতকে কুরআনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক আয়াতগুলোর একটি বলা হয়। কারণ এখানে আল্লাহ সব গুনাহগারকে তার রহমতের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তওবার সুযোগ কতদিন পর্যন্ত থাকে?
মৃত্যু কখন আসবে, তা কোনো মানুষ জানে না। তাই তওবা করার বিষয়টি কখনোই ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ
‘আল্লাহ বান্দার তওবা ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয়।’ (তিরমিজি ৩৫৩৭)
অর্থাৎ মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে তওবার সময় শেষ হয়ে যায়। তাই জীবিত অবস্থাতেই দ্রুত আল্লাহর দিকে ফিরে আসা প্রয়োজন।
ইসলামের দৃষ্টিতে তওবা শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলার নাম নয়; বরং এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। তাহলো—
১. আন্তরিক অনুশোচনা
অতীতে করা গুনাহের জন্য অন্তরে গভীর অনুতাপ ও লজ্জাবোধ থাকতে হবে।
২. পাপ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা
যে গুনাহে লিপ্ত ছিল, তা অবিলম্বে পরিত্যাগ করতে হবে এবং সেই পাপের পরিবেশ ও কারণ থেকেও দূরে থাকতে হবে।
৩. ভবিষ্যতে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প
আবার সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতে হবে এবং নেক আমলের মাধ্যমে নিজের জীবনকে আলোকিত করতে হবে।
বান্দার হক নষ্ট করলে কী করতে হবে?
উপরের শর্তগুলো মূলত আল্লাহর হকের সঙ্গে সম্পর্কিত গুনাহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু যদি কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা হয়, কাউকে কষ্ট দেওয়া হয়, কারও অধিকার নষ্ট করা হয় কিংবা কোনো মানুষের প্রতি জুলুম করা হয়, তাহলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে—
> ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
> তার পাওনা বা অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
> প্রয়োজন হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এসব সম্পন্ন না হলে তওবা পূর্ণতা লাভ করে না।
খাঁটি তওবা অতীতের সব গুনাহ মুছে দেয়
তওবার সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো— সঠিকভাবে তওবা করলে অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ
‘যে ব্যক্তি পাপ থেকে তওবা করে, সে এমন ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহই নেই।’ (ইবনে মাজাহ ৪২৫০)
এটি একজন গুনাহগার মানুষের জন্য কত বড় সুসংবাদ, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
পুরনো পাপ নিয়ে পড়ে থাকবেন না
তওবার পরও অনেক মানুষ অতীতের ভুলগুলো বারবার মনে করে হতাশ হয়ে পড়ে। এটি শয়তানের একটি বড় কৌশল।
তাই ইসলামিক স্কলাররা বলেন, শিকারি কুকুরের তাড়া খাওয়া হরিণ যদি বারবার পেছনে তাকায়, তাহলে তার গতি কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সে শিকার হয়ে পড়ে। একইভাবে একজন মানুষ যদি তওবার পরও সবসময় অতীতের গুনাহ নিয়েই পড়ে থাকে, তাহলে শয়তান তাকে আবার সেই পথে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তাই আন্তরিক তওবার পর অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
গুনাহ মানুষের দুর্বলতা, কিন্তু তওবা মুমিনের শক্তি। আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য ক্ষমার দরজা এতটাই প্রশস্ত করে রেখেছেন যে, মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তা খোলা থাকে। তাই কোনো পাপী মানুষের জন্য হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। বরং আজই, এই মুহূর্তেই অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা উচিত।
একুশে সংবাদ/ওজি



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

