ঢাকা শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১, ১ কার্তিক ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমাদের দায়িত্ববোধ!


Ekushey Sangbad
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫:০৯ পিএম, ৭ অক্টোবর, ২০২১
বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও আমাদের দায়িত্ববোধ!

ইউনেস্কোর ২৬ তম অধিবেশনে ১৯৯৪ সালে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কো মহাপরিচালক ড. ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষনার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর “বিশ্ব শিক্ষক দিবস“ পালনের শুভ সূচনা করা হয়। এর পর থেকে ১৯৯৫ সালের  ৫ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ কারণেই, একজন আদর্শ শিক্ষক সচ্চরিত্রের গুণাবলী অর্জন ও চর্চায় কোন আপোষ করেন না। ঈমান, আমল, তাক্বওয়া, আমানতকারী, ওয়াদা পালন, শালীনতা, শিষ্টাচারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মীয়তা, মেহমানদারী, সত্যবাদিতা, সততা, মানবসেবা, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ, কর্তব্যপরায়ণতা, মিতব্যয়িতা, পরোপকারীতা, আত্মার পবিত্রতা, পরিচ্ছন্ন বেশভূষা ইত্যাদি সৎগুণ তার চরিত্রের ভূষণ।

একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার উৎপত্তি সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষা শব্দের উৎপত্তি মূলত-বাংলায় ‘শিক্ষা‘ শব্দটি সংস্কৃত ধাতু শাস থেকে এসেছে। যার অর্থ হল শাসন করা । শিক্ষা শব্দটির সমার্থক শব্দ ‘বিদ্যা’ সংস্কৃত ধাতু বিদ থেকে এসেছে , যার অর্থ হল ‘জানা’ বা ‘জ্ঞান’ অর্জন করা । শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ Education শব্দটির উৎস কয়েকটি ল্যাটিন শব্দ থেকে । কারো মতে শব্দটি ল্যাটিন Educere থেকে উদ্ভূত , যার ইংরেজি অর্থ হচ্ছে To lead out অর্থাৎ শিশু এবং শিক্ষার্থীর মনের মধ্যে যে সব মানসিক শক্তি জন্মসূত্রে বিদ্যমান সেগুলিকে বাইরে আনা ।

আবার অন্যভাবেও বলা যায় – Education শব্দটির মূল ল্যাটিন শব্দ Educare থেকে উদ্ভূত যার অর্থ হল To bring up – অর্থাৎ প্রতিপালন করা বা পরিচর্যা কর । এই অর্থে শিক্ষা হচ্ছে , কতগুলি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আদর্শ সামনে রেখে শিশুকে সঠিকভাবে লালন-পালন করার প্রক্রিয়া।

বিভিন্ন শিক্ষাবিদের মতে শিক্ষার সংজ্ঞা :-

শিক্ষা হল শিশুর নিজস্ব ক্ষমতা অনুযায়ী দেহ মনের সার্বিক বিকাশের সহায়ক প্রক্রিয়া। — প্লেটো।
শিক্ষা হল অন্তর্নিহিত সুপ্ত সম্ভাবনার উন্মেষ সাধন । — ফ্রয়বেল।
অ্যারিস্টটলের ভাষায় – “Every art does something good, Education is an art. It is to be seen what good is done by Education to man and society.“
শিক্ষা একটি পরিবর্তনশীল নিরবচ্ছিন্ন গতিশীল সচেতন সামাজিক প্রক্রিয়া। তাই শিক্ষার লক্ষ্য যুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ্দের দ্বারা বিভিন্ন শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ব্যাঘাত করেছে ।

কোন কোন শিক্ষাবিদের মতে শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীকে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়তা করা । যেমন সক্রেটিস বলেছেন – Knowledge is power by which things are done.
Herbert বলেছেন – A handful of good life is worth a bushel of learning. অর্থাৎ অনেক বেশি শিক্ষার থেকে কয়েকটি সৎ জীবন অনেক শ্রেয়।

শিক্ষকের মনস্তত্ত্ব (Psychology of being a teacher):

শিক্ষক হল মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষাদান একটি জটিল ও কঠিন কাজ। এ কাজটি যিনি করে থাকেন তিনি শিক্ষক। শিক্ষককে জীবন্ত উপাদান নিয়ে কাজ করতে হয় বলে শিক্ষকতা একটি উচু দরের শিল্প। শিক্ষক শুধু খবরের উৎস বা ভাণ্ডার নন, কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহকারী নন। শিক্ষক শিশুর বন্ধু, পরিচালক ও যোগ্য উপদেষ্টা। শিক্ষার সর্বস্তরে শিক্ষকই হলেন শিক্ষাকর্মের মূল উৎস।
একজন আদর্শ শিক্ষকের পক্ষেই সম্ভব শিক্ষার কাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা ।

শিক্ষক সম্পর্কে প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তক রুশোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ জীবনব্যাপী শিক্ষার ভার নেবেন। তাই শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর বন্ধু, নির্দেশক, জীবনাদর্শের বাস্তব প্রতীক।

Billy Graham  বলেন, When wealth is lost, nothing is lost; when health is lost, something is lost; when character is lost, all is lost.

আদর্শ শিক্ষকের সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কোরআনে বলেন ‘তোমরা জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস কর, যদি তোমরা না জানো’ (আম্বিয়া ২১/৭)।

একজন ভাল শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of effective teacher):

বর্তমান শিক্ষাদান পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকার ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একদিকে শিক্ষাদান করা যেমন জটিল অন্যদিকে এটি মহান পেশাও বটে। এই মহান ও জটিল কাজটিকে পেশা হিসাবে নিতে হলে শিক্ষকের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের সমাহার থাকা দরকার, যা তাকে তার দায়িত্ব কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করতে সহায়তা করবে, যেমন-

১. জ্ঞানপিপাসু: একজন শিক্ষক জ্ঞানের প্রতি সদয় অনুরাগী। তিনি শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বিস্তর জ্ঞানুসন্ধ্যানে দেশ হতে দেশান্তরে ছুটে চলেন।

২. সুমধুর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন: সার্থক শিক্ষক হবেন মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। প্রথম দর্শনেই শিক্ষকের যে বৈশিষ্ট্যটি শিক্ষার্থীর মন কাড়ে, তা হলো তার শান্ত স্বভাব ও সু-প্রসন্ন ব্যক্তিত্ব। শিক্ষকের সুমধুর ব্যক্তিত্ব প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে তার প্রতি স্বাভাবিক প্রীতি ও শ্রদ্ধার ভাব জাগিয়ে তোলে।

৩. মৌলিকতা: মৌলিকতা সুশিক্ষকের একটি মূল্যবান সম্পদ। তার পরিচয়ের স্বাক্ষর বহন করে তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বিদ্যালয়ের মতো শিক্ষামূলক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে মৌলিক গুণসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা এবং তার গুণের প্রয়োগ অপরিহার্য।

৪. নবীন মানস: শিক্ষকের স্বাভাবিক সহজতাই তাকে রাখে কর্মময়, চির নবীন ও প্রাণবন্ত। নবীন মনই তাকে শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। অনুরাগের প্রতিফলনে তিনি শিক্ষার্থীদের আপনজন হওয়ার যোগ্যতা, অধিকার ও গৌরব লাভ করেন।

৫. সুস্বাস্থ্য: শিক্ষক হবেন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, সুস্বাস্থ্য মানে সুঠাম দেহ নয়। কর্মোদ্যম ও প্রাণময়তা, শান্ত মেজাজ ও পরিমিতবোধ শিক্ষকতা পেশার জন্য অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। সুস্বাস্থ্য ছাড়া এ গুণগুলির অধিকারী হওয়া সম্ভব নয়।

৬. শিশুরঞ্জন মানসিকতাসম্পন্ন: স্বার্থক শিক্ষক হবেন শিশুরঞ্জন মনের অধিকারী শিশুকে ভাল না বাসলে তিনি শিশুর সজীব মনের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, স্বপ্ন-সাধ, আশা আকাক্ষা, আনন্দ বেদনা, অনুরাগ অভিমান সম্পর্কে জানতে পারবেন না ।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “কী শিখাব, তা ভাববার কথা বটে; কিন্তু যাকে শিখাব তার সমস্ত মনটা কী করে পাওয়া যেতে পারে, সেটাও কম কথা নহে।” শিক্ষকের সুমধুর মনোভঙ্গি, সহজ প্রসন্নতা, সাহায্যদানের সদিচ্ছা অতি সহজেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে ঘিরে প্রীতিময় পরিমণ্ডল রচনা করে এবং এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্জন অনায়াসে, আনন্দময় এবং অর্থবহ হয়ে ওঠে।

৭. নমনীয়তা: চিত্তের প্রসার ও নমনীয়তা শিক্ষককে বিচিত্র ধরনের মানুষের মধ্যেও বিবিধ পরিবেশে সামঞ্জস্য বিধানের দক্ষতা দান করে। এর উৎস হচ্ছে অহং শূন্যতা। মানিয়ে চলবার ক্ষমতার সঙ্গে অন্তরে যে সহানুভূতি, সহৃদয়তা এবং নমনীয়তার স্পর্শ থাকে, তার মূলে থাকে অহংশূন্যতার অকপট গুণটি।

৮. চাহনী ও বাকশৈলী: সুশিক্ষকের শিক্ষণকর্মের দুটি চমৎকার কলাকৌশল হলো চাহনী ও বাকশৈলী। একটি অস্ফুট অপরটি ফুট। চোখের চাহনী অস্ফুট হলেও ক্ষেত্র বিশেষে এটি বাকভঙ্গিকেও গৌণ করে দিতে পারে। বিস্ময়কর শব্দ চেতনা, প্রচুর শব্দ ভাণ্ডার বাক চাতুর্য এবং শব্দ ও বাক্য প্রয়োগে প্রয়োজানুগ সংকোচন প্রসারণ, উচু-নিচ স্বর ও সংযম শিক্ষকের প্রকাশ ভঙ্গিকে সংবেদনশীল, মনোজ্ঞ ও অর্থবহ করে তোলে।

৯. মার্জিত পোশাক: আদর্শবান শিক্ষকের ব্যক্তিত্বের ভূষণ হলো সুমার্জিত আচার আচরণ এবং পরিপাটি পোশাক। আড়ম্বরের বাহুল্য আসল মানুষের ব্যক্তিত্বকে কৃত্রিম আবরণে ঢেকে রাখে। শিক্ষকের কাজ সহজকে নিয়ে সহজ হওয়ায়। তার জীবনাদর্শ সহজ জীবন ও মহৎ ভাবনা হওয়াই কাম্য।

উক্ত গুণগুলি শিক্ষক তার সহজাত এবং অর্জিত জ্ঞান অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে আয়ত্ত করবেন। নিজ পেশায় অনুরাগ ও অধিকারে ব্রতী শিক্ষক অনেক গুণই অনুশীলনের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেন।

১০. দৃঢ় মানসিকতা: প্রত্যয় দৃঢ় মানসিকতা উত্তম শিক্ষকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিটি কথায় ও কাজে, পোশাক ও রুচিতে, পেশায় ও কর্তব্য পালনে তিনি আদর্শবান, ধর্মপ্রাণ, সত্যপ্রিয় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেবেন। কেবলমাত্র আদেশ উপদেশ নয়, শিক্ষক নিজের অভ্যাস, অনুশীলন এবং জ্ঞান অভিজ্ঞতায় লব্ধ বিচিত্র কর্মের মাধ্যমে ছাত্রদের চরিত্রে বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধনে উদ্যোগী হবেন।

১১. প্রেরণা: উদ্দীপনা সঞ্চারকারী ও সুশিক্ষক শিক্ষার্থীর হৃদয়ে শিক্ষার্জনের অনুকূল প্রেরণা ও উদ্দীপনার কলাকৌশল প্রয়োগে সুনিপুণ হবেন। নিরানন্দ শিক্ষাদান ও কৃত্রিম নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক বিকাশের পরিপন্থী। কাজেই শিক্ষককে এমন সব কৌশলের চর্চা করতে হবে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফুতভাবে পাঠে মনোযোগী হবে।

১২. রসিকতা বোধ: সুশিক্ষক অবশ্যই হবেন সুরসিক। তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আনন্দ বিতরণ করবেন, তাদের আনন্দের অংশীদার হবেন কিন্তু আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ক্রমশ তামাশার কারণ হবেন না। পাঠদানে সময়োচিত রস কৌতুকের স্নিগ্ধ আমেজ ও মধুর সম্পর্ক অনুভূত হলে শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠ গ্রহণ হবে স্বচ্ছন্দ।

১৩. উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা: শিক্ষকের অতি বড় হাতিয়ার হলো উপস্থিত বুদ্ধি। বিদ্যালয়ের যে কোন আকস্মিক সমস্যার তাৎক্ষণিক মোকাবেলার জন্য অতি দ্রুত একটি বৌদ্ধিক ও যৌক্তিক সমাধানে পৌছাতে হয়। পরিবেশ পরিস্থিতির সংঙ্গে খাপ খাইয়ে যতদূর সম্ভব সৃষ্ট কোন সমস্যার দ্রুত সুরাহার উপযোগী একমাত্র বর্ন উপস্থিত বুদ্ধি।

লেখক: মো. আনিসুর রহমান মীর
সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক
ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজ
নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পাস

একুশে সংবাদ/রাফি