ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

সততার শক্তি হারিয়ে সাংবাদিক সমাজ আজ বিপদে


Ekushey Sangbad
রফিকুল ইসলাম এহ্সান সাংবাদিক ও জীবন গবেষক
১১:২৪ এএম, ১৯ মে, ২০২১
সততার শক্তি হারিয়ে সাংবাদিক সমাজ আজ বিপদে

প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের সাথে অতিরিক্ত সচিবের আচরণ খুবই দুঃখজনক, অনাকাঙ্খিত, ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক। এমন কাণ্ড কোন বিবেকবান মানুষই সমর্থন করতে ‍পারে না। নিঃসন্দেহে বিষয়টি তীব্র নিন্দার দাবি রাখে।

সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অসংগতি অনুসন্ধানের দায়িত্ব সাংবাদিকদের। সংবাদপত্রকে সমাজের দর্পন আর সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক। সাংবাদিকরা ইতিহাসের নির্মাতাও বটে। ইতিহাস সন্নিবেশিত হয় গণমাধ্যম তথা তাদের দেয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই। সবমিলিয়ে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে থাকায় সাংবাদিকদের জীবনে স্বচ্ছতা খুবই জরুরী বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ সবকিছু ভুলে পেশাদারিত্বে আপোষ করে ফেলেছেন।

আর তারই বলি হয়েছেন সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম। নিকট ভবিষ্যতে আমাদের আরো অনেককেই এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে। ডোন্ট মাইন্ড, পরিস্থিতি সে কথাই বলছে। পড়তে পড়তে নিচেয় নামুন। একতরফা ঢালাওভাবে শুধু শেখ হাসিনার সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নাই। কেন? সরকাররা এমনই হয়। হাজার হাজার বছর আগের ইতিহাসও সেই কথা বলে। অনেক সময় সাংবাদিক সহযোদ্ধাদের বলতে শুনি, সরকার গণমাধ্যমের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁ‍ড়িয়েছে।

এটাতো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সরকারের সব গোপন কথা আপনি লিখে দেবেন_ আর সরকার বাহাদুর চুপ থাকবেন, এটা কী করে আপনি ভাবতে পারেন? যদি তাই হয়_ তাহলে সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে মিডিয়া কর্মীদের সাহস, বুদ্ধি, কৌশল, সততা ও নীতির অস্ত্রটি থাকতে হতো খুবই ধারালো। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে মনে রাখতে হবে যে, বর্তমান সরকার একটা অন্যরকম গরমেন্ট।

একে তুলনা করা চলে পৃথিবীর অত্যাধুনিক ট্যাংকের সাথে। যে এই ট্যাংকের সামনে পড়বে তার কোন রক্ষে নাই। জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় অবর্নণীয় দু:খ-কষ্ট, লাঞ্চনা-অপমান ও গ্লানি-যন্ত্রণা সাথে নিয়ে লম্বা রাস্তা পাড়ি দিয়ে গরমেন্ট প্রধান ‘সো মাচ এক্সপ্রিয়েন্স’ অর্জন করেছেন। নামটি শেখ হাসিনা। বলতে গেলে জীবনের অভিজ্ঞতায় আমরা সাংবাদিকরা তার কাছে দুধের শিশু।

তিনি বর্তমান দুনিয়ার দীর্ঘ সময়ব্যাপি রাষ্ট্র পরিচালনাকারি মোস্ট সিনিয়র শাসক। তাকে কিছুই শিখিয়ে দিতে হয় না। তিনি দেশ চালান আপন বিবেক-বুদ্ধি, কৌশল ও অভিজ্ঞতা থেকে। এমন একজন ব্যক্তি ও তার সরকারের সাথে যুদ্ধ করতে যে অস্ত্র দরকার তার কিচ্ছু নেই আমাদের সাংবাদিকদের। শেখ হাসিনার সরকার কেঁপে উঠতো, যদি সাংবাদিকরা তাদের নীতি ও সততায় অটুট থাকতে পারতো। নীতি ও সততার শক্তি অনেক প্রখর ও তেজদীপ্ত।

বিগত পৃথিবীর দুনিয়া কাঁপানো রাজা বাদশারাও এই শক্তিকে ভয় পেতে বাধ্য হয়েছে পুরোদস্তুর। সত্যবাদী প্রতিপক্ষ সামনে পড়লেই তাদের ভিতরটা কেঁপে উঠেছে। যেমন- বস্ত্রহীন (চটপরা) সক্রেটিসকে ভয় পেতো তখনকার (প্রতাপশালী) গরমেন্ট। নবী ইব্রাহিম (আ.) কে নমরুদ ও নবী মুসা (আ.)কে সাংঘাতিক ভয় পেতো ফেরাউন।

এজন্যইতো কথায় আছে, ‘‘সত্যের কোন মৃত্যু নেই’’। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে আগের মতো নীতি ও সততায় ফিরে আসা দরকার। যদি তারা এটি করতে পারে_ তাহলে আমার ধারণা, ভবিষ্যতে তাদের হয়তো সরকারের হাতে আর (নাজেহাল-বেইজ্জতি) লাথি-চড় খেতে হবে না। বাংলাদেশের গণমাধ্যম কী তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পেরেছে? আমার মনে হয় না।

যদি পারতো তাহলে পেশার মযার্‍দা এমনভাবে ক্ষুন্ন হওয়ার কথা নয়। জাতির বিবেক হিসেবে_সমাজের সকলের বিবাদে সাংবাদিকদের বিচারক হিসেবে ডাকার কথা ছিলো। আগে থাকলেও_ এখন কী সেই অবস্থা আছে? মোটেও না। মানুষজন সাংবাদিক শুনলে আমাদেরকে বাসাইতো ভাড়া দিতে চায় না। আর আত্মীয়তা করার কথা না-ই-বা বললাম।

১৮ মে বিকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিবিসিকে সাফ বলে দিলেন, প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম নিজেই মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। এর অর্থ দাড়ায়, এটা ছিলো স্রেফ তার লোক দেখানো নাটক। দেখলেনতো? কেমন অসম্মানজনক কথা! মযার্দাটা রইলো কই? সাংবাদিকতার মতো অসাধারণ ও মহৎ পেশাটিকে আমরা দিনে দিনে কলুষিত করায় সমাজের কাছে আমরা হরহামেশা হেয় হচ্ছি। আগে এমন ছিলো না। বিতর্কিত ব্যক্তি সমাজ বদলের কথা বললে, কেউই তা শোনে না।

তা তিনি যেই পেশার লোকই হোন না কেন। আমরা কেউই আইনের উর্ধে না। তথ্য কমিশনের ফরমের মাধ্যমে নথিটি চাইলে হয়তো এমন ‍অনাকাঙ্খিত ঘটনা নাও ঘটতে পারতো। এটা আমার নিজস্ব মতামত। আমাদের সাংবাদিকদের মনে রাখা উচিত_এ পেশার দায়বদ্ধতা অন্যান্য পেশাজীবীদের থেকে বহুগুণ বেশী। আমাদের লেখা আইন-আদালতসহ সমাজে এভিডেন্স হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যদি তাই-ই হয়_তাহলে নিজকে স্বচ্ছ রেখে লেখা দরকার।

নিজে ঠিক থেকে লিখলে_কমিউনিটির মুখটা ছোট হয় না। সত্য উচ্চারণের দায়িত্ব সবার আগে সাংবাদিকদের। পেশাজীবীদের কখনোই পেশাদারিত্বে ছাড় দিতে নেই। সত্য এড়িয়ে চললে আস্তে আস্তে সেই সমাজ ধসে যায়। রোজিনা ইসলামের সাথে সচিবের অনাকাঙ্খিত ঘটনা তারই একটা জ্বলন্ত সিগন্যালমাত্র। পেশাদারিত্বে আপোষ করায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম তার অবস্থান ও ঐতিহ্য দুটোই হারিয়ে নেমে গেছে তলানীতে।

সাংবাদিক নেতারা বিষয়টি ভাবলে পেশাটির জন্য কল্যাণই হবে বলে মনে করি। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে সত্যকে এড়িয়ে গেলে সে সমাজ টেকে না। সত্য উচ্চারণই হলো ধর্মের আসল মেসেজ। শুধু মসজিদ, মন্দির গীর্জা ও প্যাগোডায় দৌঁড়ানো ধর্ম নয়। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধই হলো প্রকৃত ধর্ম। এটি ব্যতিরেকে ধর্ম-কর্ম অসার।