ঢাকা রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১, ২৮ চৈত্র ১৪২৭

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

ঠাকুরগাঁও শহীদের রক্তে রাঙানো  এক দিঘি


Ekushey Sangbad
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি
০১:০৭ পিএম, ২৬ মার্চ, ২০২১
ঠাকুরগাঁও শহীদের রক্তে রাঙানো  এক দিঘি

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মে মাস থেকে বিজয়ের আগপর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর বহন করছে খুনিয়াদিঘি । সম্প্রতি সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে ।  মুক্তিযুদ্ধকালে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল থানা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প । তারা রাজাকার , আলবদর বাহিনী সঙ্গে নিয়ে আশপাশের এলাকার মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে এই ক্যাম্পে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালাত । এরপর ভান্ডারা গ্রামের দিঘির পাড়ে নিয়ে রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের শরীর থেকে রক্ত ঝরাতে ঝরাতে উৎসব করত । শেষে দিঘির পানিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হতাে । শহীদের রক্তে দিঘির পানি রক্তলাল হয়ে উঠত । রানীশংকৈলের বীর মুক্তিযােদ্ধা আবু সুফিয়ান বলছিলেন এসব স্মৃতিকথা । 

তিনি বললেন , ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে রানীশংকৈলের ঘুনিয়া গ্রাম থেকে একই পরিবারের পাঁচজনকে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা । তাঁরা সবাই বীর মুক্তিযােদ্ধা ইসাহাক আলীর স্বজন । পরে নির্যাতন করে ওই পাঁচজনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ধরে আনা ১২ জনকে খুনিয়াদিঘিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় । ঘটনাটি বলতে বলতে থেমে যান তিনি । চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরে কয়েক ফোঁটা জল । চোখ মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন , খুনিয়াদিঘিতে নারকীয় নির্যাতন করে ইসাহাক আলীর চাচা মশরত আলী , তাঁর দুই জামাই তসলিম উদ্দিন ও সাদেক আলী এবং ছােট ভাই ইসলাম উদ্দিনকে হত্যা করা হয় । আর ফুফাতাে ভাই সােনা বকশ আলীর শরীরে গুলির আঘাত নিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে সেদিন ভাগ্যচক্রে ফিরে এসেছিলেন । তাঁর কাছেই আবু সুফিয়ান রানীশংকৈলের সেনাক্যাম্প ও খুনিয়াদিঘির নির্যাতনের কথাগুলাে শুনেছেন ।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মে মাস থেকে বিজয়ের আগপর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর বহন করছে । খুনিয়াদিঘি । ক্যাম্পে নির্যাতন চালিয়ে যাদের হত্যা করা হতাে , তাদের পাশাপাশি ওই দিঘির পাড়ে হত্যা করা লােকজনকেও পানিতে ফেলে দিত পাকিস্তানি সেনারা । সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে ক্যাম্প থেকে ১২ জনকে ধরে এনে যখন তাঁদের গুলি করা হয় , তখন সােনা বকশ আলীর ডান বুকের ওপরের দিকে একটি গুলি লাগে । সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি । চারদিকে ভাসতে থাকা পচাগলা লাশ আর কচুরিপানায় ঢেকে যায় তাঁর শরীর । 

ওই ঘটনার পর খুনিয়াদিঘির পানির লাশের স্তুপের মধ্যে সােনা বকশকে নড়াচড়া করতে দেখে তুলে নিয়ে যায় স্থানীয় লােকজন । এরপর তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ভারতের একটি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয় । এক মাস চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ওঠেন সােনা বকশ । সেই নির্যাতনের চিহ্ন দীর্ঘদিন বহনের পর আট বছর আগে তিনি মারা যান । সােনা বকশের ছেলে গােলাম মােস্তফা জানান , তাঁর বাবা মাঝেমধ্যে খুনিয়াদিঘির ওই বর্বরতার ঘটনা শােনাতেন । তিনি বলতেন , ক্যাম্প থেকে প্রতিদিন লােকজনকে চোখ বেঁধে সেনারা বাইরে নিয়ে যেত । কিছুক্ষণ পরই শােনা যেত গুলির শব্দ । যারা যেত , তারা আর ফিরে আসত না । ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে উপজেলার নেকমরদ বাজার থেকে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় । রহমানের ছােট ভাই আব্দুর সহমান বাধা দিলে তাঁকেও তুলে নিয়ে যায় তারা । রানীশংকৈল ক্যাম্পে রেখে চালাতে থাকে পাশবিক নির্যাতন । নির্যাতনের পর খুনিয়াদিঘিতে নিয়ে হত্যা করা হয় তাঁদের । খুনিয়াদিঘি এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের হত্যাযজ্ঞের শিকার রহমান ও সহমানের ভাতিজা ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির সদস্য আব্দুল করিম এ কথাগুলাে জানান ।

খুনিয়াদিঘির হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন হরিপুর উপজেলার সূর্য মােহন । এক অনুষ্ঠানে তিনি বেঁচে যাওয়ার লােমহর্ষ কাহিনি বলেন । দিঘির পাড়ে অন্যদের সঙ্গে সারি করে দাঁড় করানাে হয় সূর্য মােহনকেও । রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁদের শরীর থেকে রক্ত ঝরাতে থাকে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা । আর তা উপভােগ করে অন্যরা । পরে তাদের ওপর গুলি ছােড়া হয় । গুলি সূর্য মােহনের বুকের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায় । দিঘির কচুরিপানার মধ্যে মরার মতাে পড়ে থাকেন তিনি । পরে সেখান থেকে কোনােরকমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন তিনি । 

রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম বলেন , খুনিয়াদিঘিতে মােট কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল , তা নিরূপণের জন্য ১৯৯৭ সালের দিকে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল । তবে পরে সেই কাজ বেশি দূর এগােয়নি । দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মানুষের রক্তে দিঘির পানির রং গাঢ় খয়েরি হয়ে ছিল অনেক দিন । 

দিঘির উত্তর দিকে পাওয়া যায় শত শত মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গােড় । ওই হাড়গােড়ের সংখ্যা দেখে অনুমান করা যায় , ১৯৭১ সালে খুনিয়াদিঘিতে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে । দিঘি থেকে উদ্ধার করা মানুষের হাড়গােড় একটি গর্ত করে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় । পরে ওই জায়গাটিতে স্থাপন করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ । ১৯৭৩ সালে খুনিয়াদিঘি স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন জাতীয় চার নেতার একজন এ এইচ এম কামারুজ্জামান । স্মৃতিফলকে লেখা রয়েছে , ' মনে রেখ আমরা আমাদের বর্তমানকে তােমাদের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করে গেলাম ।


একুশে সংবাদ/লি/আ