ঢাকা শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৪ মাঘ ১৪২৯

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank
  1. জাতীয়
  2. রাজনীতি
  3. সারাবাংলা
  4. আন্তর্জাতিক
  5. অর্থ-বাণিজ্য
  6. খেলাধুলা
  7. বিনোদন
  8. শিক্ষা
  9. তথ্য-প্রযুক্তি
  10. অপরাধ
  11. প্রবাস
  12. পডকাস্ট

অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমান একজন আয়রনম্যান


Ekushey Sangbad
একুশে সংবাদ ডেস্ক
০৩:৪৪ পিএম, ২৫ নভেম্বর, ২০২২
অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমান একজন আয়রনম্যান

সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমান। বাংলাদেশ পুলিশের একটি ইউনিট প্রধান হিসেবে তাঁর নতুন কর্মস্থল ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ হেডকোয়াটার্স’। যিনি তার মেধা, যোগ্যতা,  সততা, কর্মনিষ্ঠা ও নিবিড় চেষ্টায় সবসময় নিজের প্রতিটি কর্মস্থলের গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছেন।

 

হাবিবুর রহমান পুলিশ বিভাগে ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পর্যন্ত তিনবার বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও দুইবার রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) পেয়েছেন।

 

একজন কর্মঠ ও নিবেদিত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার বাইরে তিনি সফল ক্রীড়া সংগঠক, লেখক, গবেষক, সমাজ সংস্কারক, সমাজ সেবক এবং বাংলাদেশ পুলিশ প্রকাশিত মাসিক পত্রিকা ‘ডিটেকটিভ’ এর সম্পাদকও। তার চেয়েও বড় কথা বহুমাত্রিক প্রতিভাসম্পন্ন হাবিবুর রহমানের বড়গুণ তিনি একজন আদর্শ ও মানবিক ব্যক্তিত্ব যা তাকে সবকিছু থেকে এগিয়ে রেখেছে।

May be an image of 12 people, people standing and text

 

শুধু ‘পদ’ মানুষকে আলোকিত করে না একজন ‘আদর্শ মানুষ’ হলে যে একটি ‘পদ’ নিজেই আলোকিত হতে পারে তার জীবন্ত উদাহরণ হাবিবুর রহমান! একজন আদর্শ মানুষ হওয়া বা ‘মানুষ মানুষের জন্য’ হওয়ার হাতেখড়িটা হয়েছিলো জন্মদাতা পিতা ও জন্মদাত্রী মাতা থেকেই যারা নিজেরাও আদর্শ মানব-মানবী হয়ে আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছেন, আমাদের অন্তর আত্মার বিশ্বাস স্রষ্টার কৃপায় উভয়ই ওপারে শান্তিতে আছেন।

 

বিশেষ করে তাঁর প্রয়াত ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক পিতা আলহাজ্ব আব্দুল আলী মোল্লা তাকে ছোটকালেই শিখিয়েছিলেন - কঠোর পরিশ্রম করতে, মানুষের সাথে মিশতে, মানুষকে সাহায্য করতে, মানুষের সাথে অকৃতিম ভালো ব্যবহার করতে, মানুষকে সম্মান করতে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে ও নির্লোভ থাকতে। পিতার প্রতিটি শিক্ষাই হাবিবুর রহমান রপ্ত করেছেন এবং কর্মজীবনে যার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করে চলেছেন।

 

একইভাবে তাঁর প্রয়াত শিক্ষানুরাগী মাতা মোসাম্মৎ রাবেয়া বেগম তাহাজ্জুদ পড়ে পড়ে স্রষ্টার নিকট এমন একটি নেক সন্তানের আশা করেছিলেন যে সুস্থ্য ও ভালো একজন মানুষ হবে- এই কথা মৃত্যুর আগে কোন একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি তার এক ঘনিষ্ট আত্মীয়কে নিজেই বলে গেছেন।

 

হাবিবুর রহমান প্রসঙ্গে এই প্রাসঙ্গিক বা মতান্তরে অপ্রাসঙ্গিক কথাগুলো বললাম এ জন্য যে, হাবিবুর রহমান একজন আদর্শ মানুষ হোক এটি তাঁর আদর্শ বাবা-মায়ের চরম প্রত্যাশিত ছিলো এবং শিশুকাল থেকেই তার ভীত গড়ে দেওয়া হয়েছিল পরম মমতায় ও নিয়ম শৃংঙ্খলার মাধ্যমে। পরবর্তী আলোচনায় এর কিছুটা হয়তো আঁচ করা যাবে।

 

হাবিবুর রহমান ছাত্র জীবনে মানুষকে প্রাইভেট পড়াতেন কিন্তু কোন টাকা নিতেন না। যিনি পড়াশুনার পাশাপাশি একজন সাংবাদিক ছিলেন কিন্তু সেটা নিজের জন্য নয়, সেটি সমাজের উন্নয়নের জন্য। সাংবদিকতার পেশা থেকে তিনি  কোনদিন কোনো সুবিধা নেননি, এমনকি তার সাথে সংবাদপত্র অফিস থেকে নিয়মিত যোগাযোগের সুবিধার্থে গোপালগঞ্জের বাসায় একটি ফ্রি টেলিফোন অফার করা হয়েছিলো তা তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি শিখেছেন কোন পরিবর্তনের করতে হলে কোন বিনিময় দিয়ে নয় বরং নিজের সবটুকু নিংড়ে দিয়ে করতে হয়।

 

ক্ষণজন্মা এই মেধাবী ব্যক্তিত্ব উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে জীবনে এমন অনেকগুলো চাকুরী পেয়েছেন যেগুলোতে শুধুমাত্র একটি পোষ্টই খালি ছিলো। জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে তিনি ১৭তম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশে সহকারি পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন।

 

সারদাতে পুলিশিং প্রশিক্ষণকালে সকল সহকর্মীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। নিজের নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা দিয়ে প্রশিক্ষণ স্যুভেনির ‘আমার হলো শুরু’র সম্পাদক নির্বাচিত হন যেখানে নিজের গবেষণালব্দ লেখনিতে স্থান পায় বাংলাদেশ পুলিশের শেকড়সন্ধানী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও করণীয় নির্ধারণ সম্পর্কিত নানান দিক।

 

প্রশিক্ষণ শেষে চট্টগ্রামের বাশখালীতে একজন প্রবেশনারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই বাশখালীর গভীর জঙ্গলে তৎকালীন সন্ত্রাসীদের অস্ত্র তৈরীর আঁখড়া আবিষ্কার করতে সক্ষম হন তিনি। প্রবেশনকাল পার করে তিনি ২০০০ সালে সহকারি পুলিশ কমিশনার (সরবরাহ) হিসেবে ডিএমপিতে প্রথম পদায়নে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ২০০১ সালে ভোলায় সহকারি পুলিশ সুপার (সার্কেল) হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে আলোচনার আসেন এই কর্মবীর হাবিবুর রহমান।

 

বলতে গেলে স্বপ্নের পুলিশিং ক্যারিয়ারের শুরুতেই পড়তে হয় নানান রোশানলে। এরপর ২০০২ সালে আরএমপিতে সহকারি পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালনকালে পুলিশিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘমেয়াদী উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই চৌকস কর্মকর্তাকে প্রায় ৫ বছর ওএসডি করে রাখা হয়। পরবর্তীতে ড. ফখরুদ্দিন এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরুতেই উত্তরার ৭নং এপিবিএন এর কোয়ার্টার মাস্টার হিসবে চাকুরী ফিরে পান হাবিবুর রহমান। এরমধ্যে তিনি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে কসোভো গমন করেন। তার আগে খুব অল্প দিনের মধ্যেই উত্তরাস্থ ৭নং এপিবিএন ও  কোয়ার্টার এলাকার সার্বিক পরিবেশ বদলে দেন তিনি।

 

এরপর শান্তি মিশন থেকে ফিরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিবর্তন হলে ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেন ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর) হিসেবে। হাবিবুর রহমান এই দায়িত্বে আসার পরেই অধিক জনপ্রিয়তা পায় ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর) পদটি, একাধারে এই পদটি অতীতের যে কোন সময় থেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

 

এই পদে থাকাকালীন তিনি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ২০১০ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন ‘পুলিশ ব্ল্যাড ব্যাংক’ যা দেশের যে কোন আধুনিক প্রাইভেট ব্ল্যাড ব্যাংকের মতোই উন্নত সেবাদানো সক্ষম। পুলিশ ব্ল্যাড ব্যাংক’ বর্তমান শুধু পুলিশ সদস্যদেরই রক্ত সরবরাহ করে না, যে কোন প্রয়োজনে সেটি এখন অসহায় ও মুমূর্ষু রুগীর পাশে দাঁড়াচ্ছে।

 

এছাড়া তিনি ওয়ান স্টপ পুলিশ ভেরিফিকেশন সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা, পুলিশ কালাচারাল টীম প্রতিষ্ঠা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে পুলিশ শপিং মল স্থাপন, মৃত্যু ও অবসর পরবর্তী পুলিশ সদস্যদের সাত দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধ, মেস বয় স্কুল স্থাপন, প্রতিটি থানার পরিবেশ উন্নয়ন এবং ডিএমপি হেড কোয়ারটার্সের সার্বিক উন্নয়নসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও উন্নয়নমূলক কাজে অবদান  রাখেন। এ সময় সাধারণ মানুষ ও অধঃস্তন পুলিশ সদস্যদের কাছে হাবিবুর রহমান একজন নক্ষত্র পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।

 

তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ’ নামে একটি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন যার মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশের অগ্রণী ভূমিকা প্রকাশ্যে আসে।

May be an image of text that says "মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ হবিবুর রহমান"

 

২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর হাবিবুর রহমান ঐতিহ্যবাহী ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি ঢাকা জেলার সার্বিক আইন-শৃংঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অভিনব সব কলা-কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষ করে চলমান ও সংঘঠিত অপরাধকে দমন করার পাশাপাশি সম্ভাব্য অপারধসমূহকে প্রতিরোধ করার উপর অধিক গুরুত্ব দেন। যার ধারাবাহিকতায় আইনের প্রয়োগিক দিক থেকে বিদ্যমান আইনের প্রতি জনমনে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ আইনের প্রতি তাদের  যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের জন্য নানাবিধ সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেন।

 

প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বাই রোটেশন বিভিন্ন মসজিদ-মন্দিরে নামাজ ও প্রার্থনায় শরীক হয়ে জনগণের সাথে মতবিনিময় করা, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় অপরাধ প্রতিরোধ করা, যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন করা, টেলি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প-কলকারখানার নিরপত্তা নিশ্চিত করা মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।

 

এ সময় মহান মুক্তি যুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমগ্র জাতির সম্মূখে চিরস্মরণীয় কর রাখতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অবস্থিত টেলিকম ভবনের পাশে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ২০১৩ সালে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং ২০১৭ সালের জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

May be an image of text

 

জাদুঘরটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত রাইফেল, বন্দুক, মর্টারশেল, হাতব্যাগ, টুপি, চশমা, মানিব্যাগ, ইউনিফর্ম, বেল্ট, টাই, স্টিক, ডায়েরি, বই, পরিচয়পত্র, কলম, মেডেল, বাঁশি, মাফলার, জায়নামাজ, খাবারের প্লেট, পানির মগ, পানির গ্লাস, রেডিও, শার্ট, প্যান্ট, র্যা ঙ্ক ব্যাজসহ টিউনিক সেট, ক্যামেরা, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, লোহার হেলমেট, হ্যান্ড মাইক, রক্তভেজা প্যান্ট-শার্ট, দেয়ালঘড়ি, এমএম রাইফেলসহ অনেক কিছু সংরক্ষণ আছে।

 

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন মাইকে ঘোষণা দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেকে এনে মাত্র ১০০ টাকায় পুলিশ কনস্টেবলে চাকুরী দেওয়ার বিষয়টি তখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। যে কারণে তিনি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ শিরোনামে ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। মূলতঃ ঢাকা জেলা থেকেই পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল প্রকার অনৈতিক লেনদেন বন্ধে ব্যাপক গনসচেতনতা তৈরী হয় এবং পুলিশে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টি আরো একধাপ এগিয়ে যায়।

 

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে তিনি সাভারে বসবাসরত ২০ হাজারেরও বেশি বেদে জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনমান উন্নয়নের  লক্ষে বিভিন্ন কর্মমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন যারমধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০৫ জন বেদে নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে পোড়াবাড়িতে কর্মসংস্থানের জন্য মিনি গার্মন্টস প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সাপ খেলা দেখানোর পেশা থেকে ফিরিয়ে এনে ৩৫ জন বেদে যুবককে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রত্যেকের জন্য চাকুরীর ব্যবস্থা করা, কোচিং সেন্টার ও কম্পিউটার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে বেদে ছেলে-মেয়েদের পড়া লেখার অতিরিক্ত সুযোগ তৈরী করা, সরকারি সহযোগিতায় ১৮টি জরাজীর্ণ রাস্তা মেরামত করা, একটি মসজিদ নির্মাণ করা এবং স্থানীয় বেদে জনসাধারণের জন্য একটি পাকা ইদগাহ নির্মাণ করাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেন।

May be an image of 2 people, animal and text that says "이 তৃতীয় জীবন"

 

উল্লেখ্য, বেদেদের জন্য নির্মিত এই ঈদগাহটিই সাভারের প্রথম পাকা ইদগাহ। আলোকিত মানুষের হাবিবুর রহমান এর প্রেরণায় বেশ কয়েকজন বেদে সন্তান বর্তমানে সারকারি ও প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরি করছেন। সাভারের বেদে জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য এবং চলমান কার্যক্রমগুলোকে আরো গতিশীল করতে  গত ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাবিবুর রহমান উত্তরণ ফাউন্ডেশন নামে একটি বেসরকারি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন যার মাধ্যমে সাভারের বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের জন্য সরকারের ত্রাণ ও দূর্যোগ ব্যাবস্থাপনা মন্ত্রালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় প্রায় ৩০০ টি বসত ঘর তৈরী করে দেওয়া হয়েছে।

May be an image of 3 people, people standing and text

 

সাভারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মুন্সীগন্জের বেদে শিশুদের জন্যও গড়ে তোলা হয়েছে স্কুল ও কম্পিউটার সেন্টার। বলতে গেলে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ৩৬ লাখ বেদে ও মান্তা সম্প্রদায়ের কাছে তিনি যেমন হয়ে উঠেছেন আশার বাতিঘর তেমনি তিনি এই জনগোষ্ঠীর সাড়ে চারশো বছরের অস্পৃশ্য ও গ্লানিময় জীবনের মুক্তিদূতও।

 

কিছুদিন আগে মানিকগন্জের ঝিটকাতে সান্দার বেদে সম্প্রদায়ের জন্য জমি ক্রয় করে একটি কবরস্থান তৈরী করে দেওয়ায় সহস্র মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন। কারণ এই জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকেই এতোদিন একটি কবর স্থানের অভাবে নিজের সামান্য শোবার জায়গার মধ্যেই প্রিয়জনকে দাফন করতে বাধ্য হতেন, মানে প্রিয়জনের কবরই ছিলো তাদের বিছানা। এই মহতি কাজে তাঁর একজন সহকর্মী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ এনায়েত করীমও অংশগ্রহণ করেন।

May be an image of 8 people, people standing and outdoors

 

হাবিবুর রহমান দীর্ঘ আট বছর নিবিড় গবেষণা করে কিছুদিন আগে বেদে জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় ভাষা ‘ঠার’ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষার বই প্রকাশ করেছেন যা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

 

May be an image of outdoors and text that says "නිর বেদে জনগোষ্ঠীর ভাষা হাবিবুর রহমান"

 

শুধু বেদে জনগোষ্ঠী নয়, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার থাকাকালীন হাবিবুর রহমান সামাজের পিছিয়ে পড়া হিজড়া সম্প্রদায়কে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে গ্রহণ করেছেন বেশ কিছু কর্মসূচি যেগুলোর মধ্যে হিজড়াদের জন্য আটটি বিউটি পার্লার, একটি মিনি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী, তিনটি গরুর খামার ও একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র  স্থাপন করেছেন। 

May be an image of 2 people and text that says "প্রথমআলো ফেক্রয়ারি ২০১৯, ১৯ মাঘ ১৪২৫ নিশাত, কেশসজ্জাবিষয়ক উচ্চতর নিতে তাঁরা ভারতে গেছেন। উচ্চতর প্রশিক্ষণে বিদেশে হিজড়া শাম্মী ওনিশাত কেশসজ্জাবিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষ র জন্য গতকাল ভারতেগেলেন হিজড়া নগোষ্ঠীর দুই সদস্য নিশাত। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত হেয়ার স্টাইল বিশেষজ্ঞ জাবেদ হাবিব প্রতিষ্ঠিত একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেবেন। উত্তরণ ফাউন্ডেশনের এস এম মাহবুব হাসান উত্তরণ ফাউন্ডেশন মধ্যে গত বছরের ২৪ অক্টোবর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুসারে প্রতিবছর উত্তরণ ফাউন্ডেশ মনোনীত দুজন করে জনগোষ্ঠীর সদস্য একাডেমিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ বিজ্ঞপ্তি"

এছাড়া পাঁচটি ফুড ভ্যানের মাধ্যমে বেশকিছু সদস্যকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের সমগ্র নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিজেদের মধ্যে থেকে অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনতে সচেষ্ট রয়েছেন। এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা বেশিরভাগই এখন সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে বরং নিজেদের শোভনীয় আচরণ ও মিষ্টি ভাষা দিয়ে তাদের আদি পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি সুযোগ মতো নিজের কর্মদক্ষতা ব্যবহার করে স্বাবলম্বী হওয়ার দৃঢ়চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

May be an image of 7 people, people standing and text

 

বেদে জনগোষ্ঠী ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের কল্যাণ ছাড়াও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার ১৩৪০ জন যৌন কর্মীর পাশে দাঁড়িয়েছে তিনি। 

May be an image of 5 people, people standing and text

পল্লীতে বাসিন্দাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া পিতৃপরিচয়হীন সন্তানদের জন্য শিক্ষা উপকরণ বিতরণের পাশাপাশি তাদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন হাবিবুর রহমান। করোনাকালীন প্রথম কোন মৃত যৌনকর্মীকে ইসলামিক শরীয়া মোতাবেক দাফনকার্য সম্পাদন করে এবং প্রথম কোন যৌনকর্মীর কুলখানির আয়োজন করে তিনি সর্বমহলের প্রসংশা কুড়িয়েছিলেন।

May be an image of 9 people, people sitting, people standing and outdoors

 

ইতিপুর্ব যৌনকর্মীরা মারা গেলে রাতের অন্ধকারে বা সকলের অগচরে মৃতদেহকে পদ্মা নদীর চরে বালুর মধ্যে গুঁজে রাখা হতো বা ইট/বালু ভর্তি বস্তা বেধে দিয়ে লাশ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। হাবিবুর রহমানের উদ্যোগে যৌন পল্লীর বাসিন্দাদের জন্য বর্তমানে একটি স্থায়ী কবরস্থান তৈরী করা হয়েছে। অনেক যৌনকর্মী ইতিমধ্যে নিজের পেশা বদল করে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছে।

 

হাবিবুর রহমান ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সুপার থেকে পুলিশ হেড কোয়াটার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি (পারসোনাল ম্যানেজমেন্ট -১) হিসেবে নিযুক্ত হন এবং বাংলাদেশে পজেটিভ পুলিশিংয়ের অগ্রযাত্রাকে আরো একধাপ এগিয়ে নেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর পদোন্নতি পেয়ে ২০১৯ সালের ১৫ মে পর্যন্ত তিনি পুলিশ হেড কোয়াটার্সের ডিআইজি (অ্যাডমিন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি সমগ্র বাংলাদেশের মেধাবী ও যোগ্য পুলিশ অফিসারদের যথাযথ পদায়নের  ক্ষেত্রে অবদান রাখেন এবং পুলিশের সামগ্রিক পেশাগত উন্নয়নে ভূমিকা পালন করেন।

 

এতোসব মৌলিক কাজের মধ্যেও তিনি বেদে জনগোষ্ঠীর জীবেনযাত্রার মানোন্নয়ন, হিজড়া সম্প্রদায় বা তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যদের স্বাবলম্বীকরণ এবং যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের কর্মকান্ড চালিয়ে গেছেন।

 

২০১৯ সালের ১৬ মে তিনি ঢাকার রেঞ্জ ডিআইজি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই চ্যালেন্জিং দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকা রেন্জের ১৩টি জেলার আইন শৃংঙ্খলার ব্যাপক উন্নতি শুরু হয়। পুলিশ হেড কোয়াটার্স এক বিজ্ঞপ্তি মারফত বাংলাদেশের বাকি সব রেন্জ ডিআইজিকে ঢাকা রেন্জের চলমান কার্যক্রমকে একটি রোল মডেল মনে করে নিজ নিজ রেন্জের কার্যক্রম পরিচালনা করার নির্দেশ দেন।

 

ঢাকা রেঞ্জের ১৩ জেলার মোট ৯৮ থানার কার্যক্রম সিসি ক্যামেররা মাধ্যমে একটি মনিটরে  সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চলছে। শুধু তাই নয়, কোন বিচ্যুতি কিংবা অনিয়ম করলেই দায়ী পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সেন্ট্রি, ডিউটি অফিসার ও হাজতখানার কর্মকাণ্ড তদারকিতে প্রতিটি থানায় তিনটি করে মোট দুশো আটাশিটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে, যেগুলো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে আশপাশের দৃশ্যও দেখা যায়।

 

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রেঞ্চ ডিআইজি কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে থানাগুলো মনিটরিংয়ে এই উদ্যোগ নেন হাবিবুর রহমান। ঢাকা রেন্জ ডিআইজি’র দায়িত্ব থাকাকালীন হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঢাকার কেরানিগন্জে গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (ওয়েসিস)। ওয়েসিস খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি শক্তপোক্ত প্রাতিষ্ঠানির কাঠামোর উপর দাড়িয়ে প্রায় ২০০ জন রুগীকে সেবাসশ্রুসা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করেছে।  

 

ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন হাবিবুর রহমান। তিনি ক্রীড়াঙ্গনে থিতিয়ে যাওয়া জাতীয় খেলা কাবাডিকে মূলধারায় তুলে এনেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সুনাম কুড়িয়ে চলেছেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে এখন তিনি বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক, এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক কাবাডি ফেডারেশনের সহ-সভাপতির দায়িত্বও সামলাচ্ছেন কার্যকরভাবে। একই সাথে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ ক্রিকেট টীম পরিচালনা কমিটির মেম্বার এবং ইতিপুর্বে একই টীমের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি দুইবার বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

 

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারের নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনাটি নিয়ে বেশ কয়েক বছর গবেষণা করেন হাবিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পুর্নাঙ্গ রায় অ্যানালাইসিস করে নির্মম সত্য ঘটনাটিকে সমগ্র জাতির কাছে তুলে ধরতে সচেষ্ট হন তিনি। অবশেষে এই জঘণ্য হত্যাজজ্ঞের পূর্ণাঙ্গ ঘটনার উপর “অভিশপ্ত আগস্ট” নামে একটি মঞ্চ নাটক তৈরী করেন যা এক বছরেই ১০০ বারেরও বেশি মঞ্চস্থ হয়েছে, এমনকি এটি এখন বিশ্ব রেকর্ড করতে চলেছে। কারণ ইতিহাসে আর কোন মঞ্চ নাটক এক বছরে ১০০ বারের বেশি মঞ্চস্থ হয়নি।

May be an image of one or more people and text that says "বঙ্গবন্ধুর কথা ও কলমে পুলিশ ভূমিকা: শেখ হাসিনা সংকলন ও সম্পাদনা হাবিবুর রহমান"

 

এছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক কিছু ছবি ও ছবির অন্তরালের গল্প নিয়ে ‘পিতা তুমি বাংলাদেশ’ নামে একটি ফটো অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন এবং পুলিশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন উক্তি ও বক্তব্য নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধুর কথা ও কলমে পুলিশ’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি বইয়ের সংকলন ও সম্পাদনা করেন যেটির ভূমিকা লিখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 

ব্যক্তি ও কর্মজীবনে হাবিবুর রহমান নিজের পুরোটাই সপে দিয়েছেন দেশের কল্যাণে, দেশের মানুষের কল্যাণে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানবতার ফেরিওয়ালাখ্যাত অতিরিক্ত আইজিপি হাবিবুর রহমান সত্যিকারের একজন আইরনম্যান - যার তুলনা হয় না।

 

একুশে সংবাদ/ফেস/পলাশ