ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
ekusheysangbad QR Code
BBS Cables
Janata Bank

হতাশার চোরাস্রোত কেন বহিবে তরুণ মনে?


Ekushey Sangbad
একুশে সংবাদ ডেস্ক
১২:১০ পিএম, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২
হতাশার চোরাস্রোত কেন বহিবে তরুণ মনে?

 

কয়েক দিন আগে রাজধানীর তেজগাঁও রেল স্টেশন এলাকায় একটি বহুতল ভবনের ছাদ হইতে লাফ দিয়া আত্মহত্যা করিয়াছিলেন হলিক্রসের নবম শ্রেণির ছাত্রী পারপিতা ফাইহা। তখন অভিযোগ উঠিয়াছিল, সাময়িকী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হইবার অপমানে তিনি আত্মহত্যা করিয়াছেন। ইহা লইয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি করিয়াছে। সেই কমিটির নিকট স্কুলটির শিক্ষার্থীরা জানাইয়াছে, দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট কার্ড আলাদাভাবে দেওয়ার কথা জানিয়া পারপিতা খুব মানসিক চাপে ছিল। কারণ, স্কুল হইতে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিভাবককে আলাদাভাবে ডাকার কারণে সেই শিক্ষার্থী বা অভিভাবকেরা আলাদাভাবে চিহ্নিত হন এবং অপমানিত বোধ করেন। ভালো ছাত্রী হিসাবে পরিচিত পারপিতা তাহার এই অনুত্তীর্ণ এবং অভিভাবকের অপমানিত হইবার বিষয়টি মানিতে না পারিয়া ১২তলা হইতে ঝাঁপ দিয়া জীবন বিসর্জন দিয়াছে। পারপিতার আত্মহত্যার দুই দিন পর রাজধানীর দক্ষিণখান থানাধীন মোল্লারটেক এলাকায় একটি ১০তলা ভবনের ছাদ হইতে লাফাইয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সানজানা নামের আরেক শিক্ষার্থী।

 

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা এক বৎসরের ব্যবধানে ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া বত্সরের শুরুতে জানাইয়াছিল একটি বেসরকারি জরিপ সংস্থা। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে আত্মহত্যার ঘটনা যেমন দ্বিগুণ বাড়িয়াছে, ২০২২-এর মাঝামাঝি সময় পার করিবার পর মনে হইতেছে এইবারও গত বারের রেকর্ড ভাঙিয়া যাইবে। পৃথিবীর অনেক শিল্পোন্নত দেশেই মধ্য ও অন্তিম বয়সে আসিয়া অনেকে রোগ-শোক হইতে নানান কারণে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হইয়া আত্মহত্যা করিয়া থাকেন। কিন্তু তরুণ বয়সিরা যদি অধিক মাত্রায় আত্মহত্যা করেন, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে, সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে বড় ধরনের সমস্যা রহিয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি বিশেষ সময়কাল, একটি সমাজ-রাষ্ট্র ও বিশ্বপরিস্থিতি সুনির্দিষ্ট করিয়া দেয় কিশোর-তরুণেরা কী ধরনের মানসিকতা লইয়া বড় হইবে। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, পারপিতা ও সানজানার মতো শত-সহস্র তারুণ্যময় ছেলেমেয়ে আমাদের সমাজে প্রবল মানসিক অসহায়ত্বে বসবাস করিতেছে। তাহাদের বুঝিবার কেহ নাই এবং তাহারা বিপথগামী হইলে সেইখান হইতে তাহাদের সঠিক পথের দিশা দেখাইবার সঠিক মানুষের সঠিক পরিবেশের এবং সঠিক সমাজব্যবস্থার অভাব রহিয়াছে। আমরা শিক্ষার্থীদের নিকট প্রত্যাশা করি যে, তাহারা একদিকে ন্যায়পরায়ণ, কর্তব্যপরায়ণ হইবেন, অন্যদিকে স্মার্ট হইবেন, প্রতিযোগিতায় সফল হইবেন, তুখোড় হইবেন পড়াশোনায়। কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েরা কীভাবে বিকাশ লাভ করিবে-তাহার পরিপ্রেক্ষিতটিও আমাদের বুঝিয়া নেওয়া প্রয়োজন। ইহার মধ্যে রহিয়াছে তাহার আর্থসামাজিক অবস্থান, লিঙ্গ বা জাতি, ভৌগোলিক অবস্থান, বাবা-মায়ের শিক্ষার ধরন, পারিবারিক জীবনচর্চা, গোষ্ঠীর ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রভাব, সমাজের যৌন আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গিসহ অনেক কিছু। এই সময় সমস্ত পরিবর্তন পূর্বপরিকল্পনামাফিক হিসাব কষিয়া হয় না। আধুনিক এই সময়ে বিশ্বায়ন, মহামারি ও স্মার্ট ফোনের ভার্চুয়াল জগত্ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সম্মান ও প্রতিযোগিতা তরুণ বয়সিদের মানসিক জগেক বিশালভাবে প্রভাবিত করিতেছে। তাহাদের মনের ওপর বহু ক্ষেত্রেই প্রচণ্ড চাপও সৃষ্টি করিতেছে।

 

সুতরাং, এই দিকগুলি আমাদের, অর্থাৎ বাবা-মা ও অভিভাবকদের বিশেষভাবে খেয়াল রাখিতে হইবে। বাবা-মায়ের ক্ষেত্রেও কতখানি কর্তৃত্ব দেখানো প্রয়োজন, কতখানি আবেগ-ভালোবাসা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, গ্রহণ-বর্জন, মতৈক্য-মতানৈক্যের দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন তাহা বুঝিতে হইবে। পরিবারে এই সকল বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করিবার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি থাকিলে কিশোর-কিশোরী-তরুণেরা তাহাদের সমস্ত মনের ভাবনা লইয়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে নিজের ধারণাগুলি বিকশিত করিতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্র-সমাজ, বিশ্বায়ন, মহামারি, যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সমস্যা কাহারো হাতে নাই, সুতরাং এই অবস্থায় অল্প বয়সিদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখিতে বাবা-মা তথা অভিভাবকদেরই সর্বাগ্রে সচেতন হইতে হইবে। দিনের শেষে পরিবারই সবচাইতে বড় রক্ষাকবচ।

 

 একুশে সংবাদ.কম/জা.হা