ঢাকা বুধবার, ০৬ জুলাই, ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

অপহরণের পর টর্চার সেলে নির্যাতন, পরে মুক্তিপণ দাবি


Ekushey Sangbad
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫:৪৯ পিএম, ২০ এপ্রিল, ২০২২
অপহরণের পর টর্চার সেলে নির্যাতন, পরে মুক্তিপণ দাবি

অপহরণের টাকায় দক্ষিণবঙ্গের বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি দিতে চাওয়া ল্যাংড়া মামুন @ মুফতি মামুনকে সহ ৪ অপহরণকারীকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ:  মাদক এবং অপহরণের কাজে ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার।

পটুয়াখালী জেলা পুলিশের রিকুইজিশনের প্রেক্ষিতে ঐ জেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার শিবু লাল দাসকে অপহরণ করার মূলহোতা ল্যাংড়া মামুন @ মুফতি মামুনসহ ৪ জনকে গত ১৯ এপ্রিল ২০২২ তারিখ দুপুর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত  মিরপুর, ভাটারা এবং গুলিস্তান এলাকায় ডিবি গুলশান বিভাগের একাধিক টিম ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো ১) ল্যাংড়া মামুন @ মুফতি মামুন, ২) পিচ্চি রানা, ৩) বিআরটিসি জসীমউদ্দীন এবং ৪) আশিকুর রহমান। তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ে ব্যবহৃত প্রাইভেটকার, মোবাইল ফোন, গামছা এবং ৪০০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

ভিকটিম শিবু লাল দাস পটুয়াখালী জেলা শহরের পরিচিত ঠিকাদার, ইজারাদার, আড়তদার এবং নানাবিধ ব্যবসায় জড়িত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। অপর ভিকটিম মিরাজ মিয়া পাজেরো জিপের ড্রাইভার। ‌ গত ১১ এপ্রিল ২০২২ তারিখ রাত সাড়ে আটটার দিকে শিবু লাল দাস গলাচিপাস্হ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজস্ব পাজেরো জীপ যোগে পটুয়াখালী শহরস্থ বাসায় ফেরার পথে ড্রাইভারসহ নিখোঁজ হন। দূরের একটি পেট্রোল পাম্পের কাছাকাছি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাজেরো জীপটিকে উদ্ধার করেছে জেলা পুলিশ।

পরিকল্পনা: পরিকল্পনা হয় গত ফেব্রুয়ারি মাসে। পটুয়াখালী লঞ্চঘাটের কাছাকাছি ল্যাংড়া মামুনের গার্মেন্টস অফিসে। তাতে অংশ নেয় ল্যাংড়া মামুন, পিচ্চি রানা,  পাভেল ও বিআরটিসির ড্রাইভার জসিম। পরে একাধিক দিন মিটিং ও অপারেশনাল পরিকল্পনা করা হয়। মিটিংয়ে ঢাকা থেকে মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে যোগ দেয় জসিম উদ্দিন মৃধা এবং তার ভাই গাড়ির দালাল  আশিক মৃধা। ১০০০০ টাকা এডভান্স দিয়ে এক সপ্তাহের জন্য গাড়ি ভাড়া করা হয় ঢাকা থেকে। সেই গাড়ি ঢাকা থেকে যায় সুদূর পটুয়াখালী। অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ইত্যাদি  অপারেশনাল কাজে ব্যবহার করার জন্য ঢাকার সাভার থেকে কেন হয় পাঁচটি বাটন ফোন। বেশি দাম দিয়ে ইতোমধ্যে অন্যজনের  নামে নিবন্ধনকৃত সিম কেনা হয় জেলা সদর থেকে। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয় একটি খেলনা পিস্তল, দুইটি সুইচ গিয়ার, তিনটি চাপাতি এবং গরু জবাই করার একটি বড় ছুরি। পরে একাধিক দিন রেকি করে ফিল্মি স্টাইলে রোমহর্ষক অপারেশন চালানো হয় ১১ এপ্রিল রাত সাড়ে আটটায়।  

লোমহর্ষক অপহরণ অপারেশন গত  ১১/০৪/২০২২ দুপুরবেলা পটুয়াখালী এয়ারপোর্টের কাছে মিলিত হয় অপহরণকারীরা। কার কোথায় কি দায়িত্ব তা  নির্ধারণ করে দেয় ল্যাংড়া মামুন এবং পিচ্চি রানা। ভিকটিমদের গতিবিধি মোবাইলে জানানোর জন্য পিচ্চি রানা  তাঁর মোটরসাইকেলে ল্যাংড়া মামুনকে  নিয়ে চলে যায় গলাচিপা ঘাটে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে ব্যারিকেড দেয়ার জন্য পটুয়াখালী-গলাচিপা হাইওয়ে রোডের শাঁখারিয়ার নির্জন জায়গায় একটা প্রাইভেট কার  এবং একটা ট্রলি নিয়ে অবস্থান নেয় ৫ জন। ল্যাংড়া মামুনের নির্দেশে পূর্বেই একটি ট্রাক্টর ভাড়া করে ড্রাইভার বিল্লাল।  ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া প্রাইভেটকারটি নিয়ে ড্রাইভার আশিক মৃধা,  পাভেল, হাবিব, সোহাগ এই চারজন অবস্থান নেয়। ল্যাংড়া মামুনের সংকেত পাওয়ার পরপরই সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে  ড্রাইভার বিল্লাল ট্রলিটি নিয়ে সুকৌশলে ভিকটিম শিবু দাসের প্রাডো জিপের  সামনে আড়াআড়ি করে অবস্থান নেয়। পিছন থেকে অনুসরণ করতে থাকা ড্রাইভার আশিক তার প্রাইভেট গাড়িটি দিয়ে  ভিকটিমের গাড়ির পিছনে  অবস্থান নিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলে । ট্রাক্টর এবং প্রাইভেটকার থেকে অপহরণকারীরা হুড়মুড় করে মুহূর্তেই উঠে যায় ভিকটিমের প্রাডো জীপে। আশিক প্রাইভেটকার ছেড়ে শিবু দাসের গাড়ির  নিয়ন্ত্রণ নেয়। গাড়িতে উঠেই বিল্লাল ,পাভেল, সোহাগ ,আশিক  বেঁধে ফেলে ভিকটিমদ্বয়কে। গামছা, টিস্যু পেপার এবং  স্কচ টেপ দিয়ে মুখ, হাত-পা বেঁধে চলতে থাকে চড়-থাপ্পড় কিল ঘুষি। সঙ্গে থাকা খেলনা পিস্তল ও ছোরা- চাকু দিয়ে ভয় দেখানো চলতে থাকে। বরগুনার আমতলী এলাকার গাজিপুরায় গিয়ে ভিকটিমের জিপ গাড়ি থেকে তাদেরকে তোলা হয় ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া কারটিতে।‌ সেখানে ভিকটিম দুইজনকে আরো ভালোভাবে বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ঢুকানো হয় । ইতোমধ্যে ভিকটিমের জীপটিকে আমতলীর একটি ফিলিং স্টেশনে ফেলে আসে। রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে ল্যাংড়া মামুন  ও পিচ্চি রানা পটুয়াখালীর বাঁধঘাট এলাকায় ভিকটিমদের বহনকারী গাড়ি বুঝে নেয়। গাড়ি চালাতে থাকে ল্যাংড়া মামুন নিজেই। ল্যাংড়া মামুন সোজা নিয়ে যায় তার এইচ ডি রোডস্হ নিজস্ব মেশিনঘর কাম  টর্চার সেলে। পরে নিয়ে যাওয়া হয় এসপি কমপ্লেক্স সুপার মার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডের অস্থায়ী সেলে। রাতভর চলে নির্যাতন। রাত ১:৪৫ টায়  রানার নির্দেশমতো বিল্লাল ভিকটিমের সিম থেকে ভিকটিমের স্ত্রীকে  ফোন দিয়ে পরের দিন দুপুর ২ ঘটিকার মধ্যে  ২০ কোটি টাকা মুক্তিপণ দিতে বলে। মুক্তিপণের টাকা না দিলে এবং বিষয়টি পুলিশকে জানালে শিবু লালকে হত্যা করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হবে বলেও সতর্ক করে দেয় অপহরণকারীরা।

ভিকটিম উদ্ধারের পরের দিন ১২ এপ্রিল রাত ১১ টায় ২৬ ঘণ্টা পরে হাত-পা এবং মুখ বাঁধা বস্তাবন্দি মুমূর্ষ অবস্থায় ভিকটিমদেরকে এসপি কমপ্লেক্স শপিং সেন্টারের আন্ডার গ্রাউন্ড থেকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী জেলা পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে চোখ- মুখ, হাত-পা খুলে দিয়ে চিকিৎসার জন্য তাদেরকে হসপিটালে ভর্তি করে জেলা পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে ল্যাংড়া মামুন@ মুফতি মামুন পঙ্গু । ইতোপূর্বে অপরাধ করতে গিয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার ডান পা উরু পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়। তার বাবা একজন মুফতি মাওলানা হওয়ায় সেও হাফেজী এবং নূরানী লাইনে দীর্ঘ পড়াশোনা করে। পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়ে অপরাধ জগতে। আপন ভগ্নিপতির বিস্তর টাকা মেরে দিয়ে পটুয়াখালী জেলা শহরে মালিক হয়েছে একাধিক দোকান এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষদের তার ২টি টর্চার সেলে আটকে রেখে আপত্তিকর ছবি তুলে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিতো টাকা। মাওলানা হিসেবে তার বাবার সুখ্যাতি এবং পঙ্গুত্বের কারণে পঙ্গু এই ক্যাডারের ভয়ে মুখ খোলে নাই অনেকেই। এবার ও ভেবেছিল শিবু লালকে অপহরণ করে মুক্তিপণ হিসেবে যে কোটি টাকা অর্জিত হবে তা দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় গার্মেন্টসের ব্যবসা শুরু করবে সে। অপর আসামি পিচ্চি রানা বিভিন্ন টোলপ্লাজায় টোল কালেকশনের কাজ করেছে। কখনো কাজ করেছে ট্রাকের মিডিয়াম্যান হিসেবে। তৃণমূলের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত থাকায় সেও ভেবেছিলে অপহরণ করে বড় অঙ্কের টাকা মারতে পারলে তা দিয়ে একাধিক ট্রাক কিনে সেও শুরু করবে ঢাকা - পটুয়াখালী রুটে পরিবহনের ব্যবসা।  BRTC ড্রাইভার জসিম উদ্দিন মৃধা ভেবেছিল অপরের গাড়ি না চালিয়ে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে নিজস্ব বাস কিনে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে পটুয়াখালী রুটে চালাবে সে। আসামি আশিক দীর্ঘদিন ধরে রেন্ট-এ-কারের দালালি করে। সে ও ভেবেছিল অপহরণ মুক্তিপণের টাকা দিয়ে একাধিক গাড়ি কিনে বড় পরিসরে রেন্ট-এ-কারের বিজনেস শুরু করবে।

আসামিদের বিরুদ্ধে মারামারি, মাদক এবং অপহরণের একাধিক মামলা রয়েছে। ল্যাংড়া মামুন@ মুফতি মামুন তার পিতার মাওলানা হিসেবে সুখ্যাতি এবং নিজের পঙ্গুত্বের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন ভান ভনিতা করে অনেক অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা করলেও সে এক দুর্ধর্ষ ক্যাডার। অপহরণ বাণিজ্য চালানোর জন্য পটুয়াখালীতে সে গড়ে তুলেছিল দুইটি টর্চার সেল।সে একজন মাদক সেবী, মাদক ব্যবসায়ী এবং নারী লোভী ব্যক্তি ও বটে। তার কৃত্রিম পায়ের ফোকরে অনায়াসে হাজার হাজার পিস ইয়াবা বহন করে নিয়ে যেতে পারত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়।

 উদ্ধার করা মাদক মামলায় আসামিদেরকে পুলিশ রিমান্ডে এনে তাদের অপরাধ ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

 

একুশে সংবাদ /এসএম