ঢাকা সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

সরকার নিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল

Ekushey Sangbad
Janata Bank
Rupalibank

বায়তুল আমান হাউজিংয়ের একটি বাড়ি নিয়ে বিরোধ


Ekushey Sangbad
একুশে সংবাদ ডেস্ক
০৬:৪৮ পিএম, ১৭ জুলাই, ২০২১
বায়তুল আমান হাউজিংয়ের একটি বাড়ি নিয়ে বিরোধ

রাজধানীর আদাবর এলাকায় বায়তুল আমান হাউজিংয়ের একটি বাড়ি পুলিশের সহযোগিতায় দখলে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছে বাড়ির ভুক্তভোগী ভাড়াটিয়ারা। তারা দাবি করে বলেন মধ্যরাতে পুলিশ হানা দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে ওই বাড়িটি থেকে ৩৫ পরিবারকে উৎখাত করা হয়েছে। এমনকি ওই বাড়ির চাবিও নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন আদাবর থানার ওসি কাজী শাহীদুজ্জামান। শুধু তাই নয় ওই বাড়ির সামনে সার্বক্ষণিক বসানো হয়েছে পুলিশ পাহারাও।

বিরোধপূর্ণ এই জমির অবস্থান আদাবরের বায়তুল আমার হাউজিংয়ের ১৭/এ নম্বর রোডে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই বাড়ির হোল্ডিং নম্বর হলো-১০৩৪/১। আদাবর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইয়াসিন মোল্লা বায়না রেজিস্ট্রি ‍সূত্রে এই জমির মালিক দাবিদার। তিনি ৬ মাস আগে জমিটির দখল বুঝে নেন। দখল বুঝে নেওয়ার পর তিনি সেখানে ভাড়াটিয়া তোলেন। ওই বাড়ির আগের মালিক রোকেয়া বেগম। তার হোল্ডিং প্লেট অনুযায়ী ওই বাড়ির নম্বরও ১০৩৪/১। মালিক হিসেবে জমির সরকারি করও তিনি এতদিন পরিশোধ করে এসেছেন।

তবে ওই প্লটটির অধিকার দাবি করছেন আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ফারুক মোল্লা। তার শ্বশুর মো. সাহাবুদ্দীন মিয়া ২০০৩ সালে জাহানারা বেগম নামে এক নারীর কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫৮ কাঠা জমি ক্রয় করেন। শ্বশুরের হয়ে জমি বুঝে পেতে মাঠে নেমেছেন ফারুক মোল্লা। তবে ফারুক মোল্লা ওই জমির হোল্ডিং নম্বর উল্লেখ করেছেন ১০৪২। ওই হোল্ডিং সংক্রান্ত প্রমাণাদিও তার কাছে আছে বলে তিনি জানান।

          

বাড়ি একটি দাবিদার দুই জন : এক প্লটের দুইজন মালিক দাবিদার হওয়ায় ওই জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইয়াসিন মোল্লা যে জমির বিবরণ দিয়েছেন তার জমির পরিমাণ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। যার সিএস খতিয়ান নম্বর ৪৩, এস এ খতিয়ান ১৩, আর এস খতিয়ান নম্বর ৩৩, সিটি জরিপ ৪৫৪৫। সিটি করপোরেশনে যার হোল্ডিং নম্বর ১০৩৪/১। অপরদিকে ফারুক মোল্লা যে জমির কথা উল্লেখ করেছেন তার সিএস ও এস এ দাগ নম্বর ১৬, আর এস দাগ নম্বর ১৫১৯, সিটি জরিপ দাগ নম্বর ১২৭। এর হোল্ডিং নম্বর: ১০৪২। এতে বোঝা যায় কাগজ-কলমে দুটি জমির পরিচয় আলাদা।

দলিল সূত্র থেকে জানা গেছে, এই জমির আদি মালিক হচ্ছে দধি মিয়া গং। পরে এই জমি হাজী ইদ্রিস আলী, হাজী টেনু মিয়া, হাজী ফৈজদ্দিন, হাজী আজিমুদ্দিন, হাজী সমির উদ্দিনের মধ্যে ২৫ শতাংশ করে বণ্টন করা হয়। হাজি ইদ্রিস আলী ও হাজী টেনু মিয়ার পর্যায়ক্রমিক উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে ২৯.০৩.১৯৭৯ সালে জমির মালিকানা পান রোকেয়া বেগম। এরপর রোকেয়া বেগম বয়সের ভারে নুয়ে পড়ায় তার মালিকানায় থাকা ৫০ শতাংশ জমির মধ্যে ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ জমির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেন হাজী মো. সালাহ উদ্দিনকে। বায়নানামা দলিল ৭৭৪৫ নম্বর মূলে গত বছরের ১৯ নভেম্বর ওই জমির মালিকানা পান আদাবর থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইয়াসিন মোল্লা। অপরদিকে হাজী সমিরউদ্দিনের পর্যায়ক্রমিক উত্তরাধিকারীদের একজন জাহানারা বেগমের কাছ থেকে ২০০৩ সালে জমি কেনেন মো. সাহাবুদ্দীন মিয়া। ওই জমির পরিমাণ ৪.৫৮ কাঠা।

দেখা গেছে ২০১৮ সালের পানির বিলের কপি অনুযায়ী সাহাবুদ্দীন মিয়ার জমির দাগ নম্বর ১৫১৯। বিলের ওই কপিতে জমির অবস্থান দেখানো হয় ১৭/বি নম্বর রোডে। তার পানি বিলের গ্রাহক নম্বর: ০৩০৮২২৩৫২৩। ফারুক মোল্লার দাবি- ওই পানির বিলের কোনো সত্যতা নেই।

ফারুক মোল্লার বিরুদ্ধে ১৪৫ ধারায় ফৌজদারি পিটিশন: জমির মালিক রোকেয়া বেগমের কাছ থেকে আমমোক্তারপ্রাপ্ত মো. সালাহ উদ্দিন গত মাসে ফারুক মোল্লার বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মইনুল হকের কাছে পিটিশন মামলা করেন। যার মামলা নম্বর ২২৩/২০২১। এই মামলায় ফারুক মোল্লাকে একমাত্র বিবাদী করা হয়েছে।

মামলার বাদী উল্লেখ করেন ওই জমির খাজনা ও হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য সরকারি কর পরিশোধ করে জমির দখল তাদের কাছে রয়েছে। গত ২৭ জুন ফারুক মোল্লার ১০/১৫ গুণ্ডাপাণ্ডা ওই জমিতে প্রবেশ করে মো. সালাহ উদ্দিনকে হুমকি-ধমকি দেয়। ১৪৫ ধারা মোতাবেক ওই জমিতে বিবাদী কিংবা বিবাদীর ভাড়া করে লোকজনের প্রবেশ বন্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ চাওয়া হয়। মামলাটি আমলে নিয়ে ৩০ জুন আদালত ইনজাংশন জারি করেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভূমি কমিশনারকে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়। এর আগে, জমি দখলকারীদের ‘ষড়যন্ত্র’ বুঝতে পেরে পিটিশন মামলা হওয়ার আগে ৩১ মে আদাবর থানায় জিডিও করেছিলেন ইয়াসিন মোল্লা। জিডি নম্বর: ১১৭১।

ওই জমিতে ইনজাংশন জারির ৩ দিনের মাথায় আদাবর থানায় ইয়াছিন মোল্লাকে ১ নম্বর আসামি ও জমির আম মোক্তার হাজী সালাহউদ্দীনকে ৬ নম্বর আসামি করে মামলা করেছেন ফারুক মোল্লা। ওই মামলায় জমিতে অনু্প্রবেশ করে হাঙ্গামা সৃষ্টি, ভাড়াটিয়াদের বিতাড়ন, স্বর্ণের গয়না চুরি, মোটর চুরি, ফ্যান চুরির অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে।

ইয়াছিন মোল্লা বলেন, আমি আগে থানায় জিডি করেছিলাম। সেটির বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। পিটিশন মামলার পর জমির ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন আদালত। এই বিষয়টি বুঝতে পেরে ফারুক মোল্লা আমাদের দমন করার জন্য মামলা করেছেন। মামলার নামে আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির নাম ভাঙিয়ে ফারুক মোল্লা পুলিশ প্রশাসনকে প্রভাবিত করছে বলে অভিযোগ করেন।

         

ইয়াসিন মোল্লা অভিযোগ করে বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার নামে তাকে থানায় ডাকা হয়। সোমবার (১২ জুলাই) ডিসি অফিসে এটি নিয়ে মীমাংসা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। ওই বিষয়টি জানিয়ে ইয়াসিন মোল্লাকে থানায় ডেকে নেন আদাবর থানার ওসি কাজী শাহীদুজ্জামান। ওইদিন রাত ১২টার দিকে ওসি জানান, তার কিছু করার নেই। ফারুক মোল্লার করা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হলো।

থানায় বসে ইয়াসিন মোল্লা বিষয়টি তার স্বজনদের জানান। ইয়াসিন মোল্লাকে থানায় গ্রেফতার দেখানোর পর তার দখলে থাকা ওই বাড়িতে ১০/১২ জন পুলিশের একটি টিম প্রবেশ করে। ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ ইয়াসিন মোল্লাকে থানায় গ্রেফতার করে ভাড়াটিয়া উৎখাতে নামে পুলিশ। রাতেই ইয়াসিন মোল্লার বাড়িতে থাকা ৩৫টি পরিবারকে জোর করে বের করে দেয় পুলিশ। পুলিশ বলে, ১০ মিনিটের মধ্যে সব ভাড়াটিয়াদের বের হয়ে যেতে হবে। রোববার রাত ১২টার দিকে পুলিশ ৩৫ পরিবারের শতাধিক লোককে পথে নামিয়ে দেয়। এমনকি ওই বাড়ির চাবি নিজের দখলে রেখেছেন থানার ওসি। পরদিন দিনের বেলায় ইয়াসিন মোল্লাকে মামলায় আদালতে চালান দেওয়া হয়। তবে আদালতে চালান দেওয়ার দিনই জামিন পেয়ে বের হয়ে আসেন ইয়াসিন মোল্লা। পরে বিকেলে নিজের বাসায় সংবাদ সম্মেলন করেন ইয়াসিন মোল্লা।

বাড়ির চাবি নিজের কাছে রাখার বিষয়ে আদাবর থানার ওসি বলেন, ‘ইয়াসিন মোল্লা থানায় এসে নিজের ভুল স্বীকার করেছে। সে নিজেই আমার হাতে চাবি দিয়ে গেছে। আর যেহেতু মামলা হয়েছে তাকে ওই মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। আমি কোনো অন্যায় কাজ করিনি।’

ওসি আরও দাবি করে বলেন, ভাড়াটিয়ারা ইয়াসিন মোল্লার লোক। তারা ইয়াসিন মোল্লার কথায় এসেছে। ইয়াসিন মোল্লার কথায় বেরিয়ে গেছে। তবে ভাড়াটিয়া বলেন, পুলিশ তাদের জোর করে বের করে দিয়েছে। বের হতে না চাওয়ায় তাদের নাজেহাল করা হয়েছে।

‘ইনজাংশন’ লঙ্ঘন পুলিশের, পথে ৩৫ পরিবারের শতাধিক মানুষ: বিরোধপূর্ণ ওই জমির বিষয়ে আদালত ইনজাংশন দিলেও তার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, কোনো সম্পত্তিতে স্থিতিবস্থা দেওয়ার অর্থ হলো ওই সম্পত্তি যে অবস্থায় থাকবে সেই অবস্থায় রাখা। ওই বাড়িতে কোনো ভাড়াটিয়া থাকলে তা উৎখাত করার এখতিয়ার পুলিশের নেই।

ওই রাতে পুলিশের ভূমিকা দেখেছেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘রাত ১২টার দিকে পুলিশ আসে। ভাড়াটিয়াদের জোর করে রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অপু নামে ভুক্তভোগী এক প্রতিবন্ধী কিশোর বলে, দুর্ঘটনায় আমার দুই পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি ক্র্যাচ ছাড়া হাঁটতে পারি না। এই অবস্থায় পুলিশ আমাকে বের করে দিয়েছে। আমি সারারাত বাইরে ছিলাম। ঘুমুতে পারিনি।’

মুক্তা নামে একজন ভাড়াটিয়া বলেন, আমি চার মাস আগে এখানে ভাড়া আসি। পুলিশ বাসায় এসে বলে তোমাদের ১০ মিনিট সময় দেওয়া হলো। ১০ মিনিটের জায়গায় ১১ ‍মিনিট সময় পাবে না। এখুনি বের হয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন লকডাউনের মধ্যে সবাইকে ঘরে থাকার জন্য বলা হচ্ছে। আর সেখানে পুলিশ আমাদের বের করে দিয়েছে। পুলিশের কারণে আমরা বিপদে পড়েছি।

রেজাউল নামে একজন ভাড়াটিয়া বলেন, আমরা ভয়ে আছি। বাড়ির সামনে গেলে পুলিশ আমাদের দিকে তেড়ে আসে। সবসময় ওই বাড়ির সামনে পুলিশ থাকে। কখনও এক গাড়ি, কখনও দুই গাড়ি পুলিশ রাখা হয়েছে।

ভাড়াটিয়া একজন নারী বলেন, ‘ওই বাসার মধ্যে আমার কয়েকটি কবুতর ছিল। ওই কবুতরগুলোর কী অবস্থা জানি না। তাদের খাবার দিতে পারছি না। কবুতরগুলো বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে জানি না।’

ইয়াসিন মোল্লা বলেন, ওই ভাড়াটিয়াদের কেউ কেউ এসে আমার গ্যারেজে আশ্রয় নিয়েছে। আমি তাদের রান্না করে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছি। করোনার মধ্যে বিধি-নিষেধ চলছে এই অবস্থায় তারা কোথাও যেতেও পারছে না। জমি আমার হলে আমি পাব, আমার কাগজপত্র ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাই ভাড়াটিয়াদের এই কষ্ট দূর হোক। তারা যেন পথে পথে না ঘোরে।

ভাড়াটিয়াদের বের করে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আদাবর থানার ওসি কাজী শাহীদুজ্জামান বলেন, এটি দেওয়ানি বিরোধ, কিন্তু জমির দখল নিয়ে সেখানে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত করতে পারে তাই ওইদিন এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল ছিল। ওই ভাড়াটিয়ারা ইয়াসিন মোল্লার লোকজন। ইয়াসিন মোল্লা তাদের জোর করে ওই বাড়িতে ঢুকিয়েছে বলে থানায় অভিযোগ ছিল। ইয়াসিন মোল্লা থানায় এসে নিজের ভুল স্বীকার করেছে এবং চাবি আমার হাতে দিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, কেউ ভাড়াটিয়াদের বের করেনি। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ভাড়াটিয়ারা যে যার মতো চলে গেছে।

সাংবাদিকদের ওসি জানান, ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলে ভাড়াটিয়াদের আশ্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাদের তালা যেন খুলে দেওয়া হয় সেটির ব্যবস্থা করব।

মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মাহিন ফরাজী বলেন, আমরা তো কোনো ভাড়াটিয়াকে চিনি না। তাদের বের করে দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।ভাড়াটিয়ারা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে উল্লেখ করলে এসি বলেন, এ রকম অভিযোগ আসতেই পারে। এর কোনো ভিত্তি নেই।

           

পুলিশের এত আগ্রহ কেন, প্রশ্ন আইনজীবীদের : ২০১৯ সালে এক সার্কুলারে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া উল্লেখ করেন, কারও পাওনা টাকা আদায় কিংবা জমি-ফ্ল্যাট দখল বা বেদখলে কোনো পুলিশ সদস্য জড়ালে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিএমপির ওই সার্কুলারে বলা হয়েছে, অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে ঈদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কিছু সদস্য দেওয়ানি আদালতের বিচার্য বিবাদীয় পক্ষের অর্থ আদায়, জমি, প্লট, ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ির দখল বুঝিয়ে দেওয়া বা উচ্ছেদ করার বিষয়ে নিজেদের জড়াচ্ছেন। এরূপ কর্মকাণ্ডে পুলিশ সদস্যদের জড়িত না হওয়ার জন্য অফিস আদেশের মাধ্যমে ডিএমপিতে কর্মরত সব পুলিশ সদস্যকে নির্দেশ দেওয়া হলো।

সার্কুলারে আরও বলা হয়, দেশে প্রচলিত ও বিদ্যমান দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল), পুলিশ আইন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্সসহ বলবৎ যে কোনো আইনে বিবাদীয় পক্ষের মধ্যে অর্থ আদায় সম্পর্কিত, দেনা-পাওনা সম্পর্কিত, জমি, ফ্ল্যাট কিংবা বাড়ি দখল বুঝিয়ে দেওয়া বা বেদখল করার কোনো আইনগত ক্ষমতা পুলিশের নেই। পুলিশ সদস্যরা আইনি ক্ষমতা ও বিধির বাইরে এই সব কাজে জড়িত হলে পুলিশের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সংশ্লিষ্ট ডিসি, এডিসি ও এসিরা নিজ অধিক্ষেত্রে (ইউনিট) কর্মরত কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা যেন এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত না হন, সেই বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি যদি কোনো পুলিশ সদস্যকে কোনো ব্যক্তি বা মহল এই ধরনের কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়ার নির্দেশ দেন বা চাপ প্রয়োগ করেন তা সরাসরি ডিএমপি কমিশনারকে বা নিজ নিজ ইউনিটের প্রধানকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদাবরের বিরোধপূর্ণ ওই বাড়ির বিষয়ে পুলিশ হস্তক্ষেপ করার বিষয়টি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।

ইয়াসিন মোল্লার আইনজীবীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, কোনো বিরোধপূর্ণ সম্পত্তির বিষয়ে ইনজাংশন দেওয়ার অর্থ হলো যে অবস্থায় আছে সেটি ওই অবস্থায়ই রাখতে হবে। রাতের আঁধারে ভাড়াটিয়াদের বের করে দিয়ে পুলিশ আদালতকে অমান্য করেছে।

ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী জিল্লুর রহমান বলেন, পুলিশ কী কারণে এত উৎসাহী ভাড়াটিয়া বের করে দেওয়ার বিষয়টি অমানবিক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধ। পুলিশের কাছ থেকে এরকম আচরণ প্রত্যাশা করা যায় না। পুলিশ কেন এরকম প্রবণতা দেখাচ্ছে সেটির যৌক্তিক কারণ থাকা দরকার বলে মনে করি।

তল্লাশির নামে পুলিশের হয়রানি: মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) বিকেলে আদাবর থানা থেকে ১০/১২ জনের পুলিশের একটি দল যায় শনিরবিল হাউজিংয়ে ইয়াসিন মোল্লার বাসায় তল্লাশি করতে। সেখানে গিয়ে বলা হয়, আমরা তল্লাশি চালাব। কিছুক্ষণ তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ ফিরে যায়। বুধবার (১৪ জুলাই) সকালে একই বাসায় তল্লাশির জন্য ১৫ জনের একটি টিম পাঠান আদাবর থানার ওসি। ওই টিমে ছয়জন নারী সদস্যও ছিলেন। তারা তল্লাশি চালিয়ে আবার ফিরে যায়।

পুলিশের এরকম কর্মকাণ্ড মানসিক হয়রানির শামিল বলে অভিযোগ করেছেন ইয়াসিন মোল্লা। তিনি বলেন, প্রশাসন আমার মনোবল দুর্বল করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কারণে-অকারণে আমার বাসায় পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও আমার পরিবারকে ক্ষতি করার জন্য প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আইন অনুসারে— পুলিশ কোনো নাগরিকের গৃহ তল্লাশি করতে পারে শুধু দু’ভাবে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে- আদালত থেকে ইস্যুকৃত তল্লাশি পরোয়ানা বলে অথবা কোনো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে শুধু সেই মামলার আসামি গ্রেফতার বা মালামাল উদ্ধারকল্পে। (ফৌজদারি কার্যবিধির. ধারা-৯৬, ৯৮, ৯৯ ক, ১০০, ৪৭ ও ১৬৫; অস্ত্র আইন-২৫; জুয়া আইন-৫)। আর ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা মোতাবেক গৃহ তল্লাশির পদ্ধতি ও নিয়ম হলো— তল্লাশি শুরু করার আগেই পুলিশ কর্মকর্তা স্থানীয় দুই বা ততধিক সম্মানিত অধিবাসীকে সরেজমিন উপস্থিত থেকে তাতে সাক্ষী হওয়ার জন্য প্রয়োজনে লিখিতভাবে অনুরোধ করবেন। তল্লাশিকালে গৃহকর্তা অথবা তার মনোনীত কোনো প্রতিনিধিকে অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।

তল্লাশির নামে পুলিশের ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করে ঢাকা বারের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় বলেন, ‘কারও বাসায় তল্লাশি চালাতে হলে অবশ্যই আইন মেনে করতে হবে। মামলায় জামিন পাওয়ার পরদিন কোনো আসামির বাড়িতে তল্লাশি করতে যাওয়ার অর্থ হলো পুলিশের অন্য কোনো ইনটেনশন রয়েছে। আইনের বাইরে যাওয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই।

         

ফারুক মোল্লার দাবি ওই বাড়িটি তার শ্বশুরের। তিনি সেটি বুঝে নিতে চান।

জমির বিষয়ে ফারুক মোল্লা বলেন, ওই জমি আমার শ্বশুর কিনেছেন। আমার শ্বশুর দেশের বাইরে থাকায় তার হয়ে আমি কাজ করছি। আমার দাবি ন্যায্য। তাই আমি আইনের আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের চৌহদ্দির সম্পত্তি তো অন্যজনের কাছে বিক্রি করা যায় না।

জমি আপনি চাইলে তো ভূমি অফিসের মাধ্যমে বের করতে পারেন উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ২০০৩ সালে ওই চৌহদ্দিতে আমরা জমি কিনেছি। ২০২০ সালে একজন এসে বলবে ওই জমি আমার তা কী হবে? জমি বের করার জন্য বাটোয়ারা মামলা করতে চাইলে তারা করুক। আইন-আদালত সবার জন্য খোলা।

‘আমার কাগজপত্র প্রশাসন দেখেছে। দেখে তারা বুঝেছে কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়? পুলিশ ইয়াসিন মোল্লাকে সাইনবোর্ড নামানোর জন্য বলেছে, ‘ইয়াসিন মোল্লা সাইনবোর্ড নামায়নি। পুলিশ যাওয়ার পর ভাড়াটিয়ারা বের হয়েছে। তবে কোনো ভাড়াটিয়াকে পুলিশ জোর করে বের করে দেয়নি। আমার কেনা সম্পত্তি থেকে গায়ের জোরে বের করে দেওয়া হবে, এটি কি মগের মুল্লুক?

তিনি আরও বলেন, ইয়াসিন মোল্লার বিষয়ে অনেক ক্রাইম রিপোর্টার অনুসন্ধান শুরু করেছে, অনেক চ্যানেল কাজ করছে। আমি লিগ্যাল। একটা জিনিস বুঝি, সত্যের জয় ধীরে ধীরে হবে, মিথ্যার জয় কখনও হবে না।

তিনি বলেন, ইয়াসিন মোল্লা আমাকে ফোনে হুমকি দেয়। থানার ভেতরেও আমাকে ইয়াসিন মোল্লা হুমকি দিয়েছে। আমাকে দেখে নেবে। ওই জমির প্যানটাগ্রাফ করেছি। আমি ভুল জায়গায় নেই।

ফারুক মোল্লা বলেন, আমি বিভিন্নজনকে আমাদের কাগজপত্র দেখিয়েছি, উকিলকেও দেখিয়েছে। তারা বলেছে, মোহাম্মদপুরে-আদাবরে আমার মতো এরকম ফ্রেশ কাগজ আর কারও নেই। এই কারণে বলছি আমাদের দাবি সত্য।

তিনি বলেন, বায়না করে জমির দখল কি কেউ নিতে পারে? ইয়াসিন মোল্লা জোর করতে পারে না। ওসির কাছে ওই বাড়ির চাবি রয়েছে। আমি এখনও ওসির কাছ থেকে চাবি নিইনি।

একুশে সংবাদ/রাফি/সা:বা: