পাহাড়ি ছড়া বেষ্টিত মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ এবং কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন নদী ও ছড়া থেকে অবাধে তোলা হচ্ছে বালু। ফলে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এতে হুমকির মুখে পরিবেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অবকাঠমো, ফসলের জমি ও বসতবাড়ি। ইজারাবিহীন এসব বালুর মহাল থেকে বেশি বালু উত্তোলন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে বোমা মেশিন এবং পরিবহনে চালাতে হচ্ছে বড় বড় ট্রাক।
এতে বালুবাহী ট্রাকে একের পর দুর্ঘটনাসহ ঘটছে প্রাণহানীর ঘটনাও। গত রোববার (৩১মে) শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর চৌমুহনা (সরকার বাজার) এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের সাথে সিএনজি ও ইজিবাইক মুখামুখি সংঘর্ষে ছয় জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শিপন ও রাসেল নামে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে একজন সিলেট এবং অন্যজন ঢাকায় চিকিৎসাীন রয়েছেন। আহত অন্যরা সিলেট উসমানী মেডিকেল কলেজ ও মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এছাড়া সম্প্রতি উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ববানপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় নারীসহ একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক বছরে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর, সাতগাঁও এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বালুবাহী ট্রাকে স্কুল শিক্ষার্থীসহ একাধিক মৃত্যুর ঘটনাসহ ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
ভুনবীর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা ফেরদৌসী আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালুর ব্যবসা করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। আওয়ামী লীগের পতনের পরও তিনি এলাকায় অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত রোববার ভুনবীর ইউনিয়নে তার অবৈধ বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা গুরুতর আহত হয়েছেন কয়েকজন।
আশিদ্রোন ইউনিয়নের পারেরটং গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, বশির, জামাল, শামীম সিন্ডিকেট এর নেতৃত্বে স্থানীয় ছড়া থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
শহরতলীর রামনগর গাজীপুর এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগ, আশিদ্রোন ইউনিয়নের রামনগর গাজীপুর ফুল ছড়া (গাং) থেকে সোহাগ মিয়া, বাছির মিয়া, আমির মিয়া, সিরাজ মিয়া, আমজাদ মিয়া, সফিক মিয়া, কাসেম মিয়া, শাহজাহান, বিল্লাল মিয়ার নেতৃত্বে এই ছড়া থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করে ছড়ারপাড় ও পরিবেশ বিধ্বংস কার্যক্রম চলছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া, উদনা ছড়া, বিলাশ নদী, পুটিয়াছড়া এবং বধ্যভূমি সংলগ্ন ছড়াসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নদী-ছড়া থেকে অবৈধভাবে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। একই চিত্র কমলগঞ্জ এবং কুলাউড়া উপজেলার।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, পরিবেশ-প্রতিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা, ঘটনাস্থলে পাওয়া অভিযুক্তদের জরিমানাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। বালু উত্তোলনকারীদের শনাক্ত করে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান ইউএনও।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের ছয়ঘড়ি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভেকু মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে প্রাকৃতিক টিলার লাল মাটি কেটে সমতলে পরিণত করছেন।
একই উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের সুনছড়া চা-বাগানসংলগ্ন টিলাভূমি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র টিলা ও পাহাড়ি ছড়ার বাঁধ কেটে সিলিকা বালু উত্তোলন করে আসছে। উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর এলাকায় ধলাই নদের ওপর স্টিল সেতুর নিচ থেকে অবাধে পলিমাটি কেটে ট্রাকযোগে স্থানান্তর করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে নদীর বাঁধ ও সেতুর নিচ থেকে মাটি উত্তোলন করে নিচ্ছে। ফলে সেতুটি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। যেকোনো সময় সেতু ধসে পড়তে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।
এসব বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টিলা কাটা, পাহাড়ি ছড়া ও ছড়ার পার্শ্ববর্তী স্থান কেটে সিলিকা বালু উত্তোলন করে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। ট্রাক, পিকআপ ও ট্রলিযোগে এই সিলিকা বালু পরিবহন ও বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে।
অবাধে পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রমের বিষয়ে স্থানীয় কলেজ শিক্ষক জমশেদ আলী, পেশাজীবী সোলেমান মিয়া, চা-শ্রমিক নেতা সীতারাম বীনসহ স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের অবহেলার কারণে উপজেলার প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় স্থান নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ ও আশপাশের রাস্তঘাট, কৃষিজমি, সেতু-কালভার্ট হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
কমলগঞ্জ ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, টিলা কাটাসহ সেতুর নিচ থেকে মাটি কাটা ও সুনছড়া থেকে সিলিকা বালু উত্তোলন বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ‘বড়ছড়া’ থেকে সরকারিভাবে ইজারা বন্ধ থাকার পরও স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট চক্র রাতের আধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জনজীবন হুমকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয় লোকদের অভিযোগ, রাজিব উদ্দিন নামে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি ছড়া থেকে রাতের অন্ধকারে বালু উত্তোলন করে তা বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার বরমচালের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ এই বড়ছড়া থেকে নির্বিচারে সিলিকা বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিগত দিনেও এই ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও অবকাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, বড়ছড়ার ওপর নির্মিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং বোরো চাষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি সুইচ গেট। বালু উত্তোলনের ফলে সেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় এগুলো এখন কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত দুর্বল। বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা রেললাইন ও সিলেট-ব্রাহ্মণবাজার সড়কের ওপর নির্মিত সেতু যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দার্ অভিযোগ, বরমচাল ইউনিয়ন পরিষদের ৪,৫,৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রানু বেগমের ছেলে রাজিব উদ্দিনের নেতৃত্বে শক্ত একটি সিন্ডিকেট চক্র বড়ছড়া থেকে রাতের আধারে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক ট্র্যাক সিলিকা বালু বিক্রি করা হয় ১৭-১৮ হাজার টাকা। এভাবে প্রতিনিয়ত ট্র্যাক, রিকশা, ভ্যান দিয়ে রাতের আধারে লক্ষ লক্ষ টাকার বালু বিক্রি চলছে। এই রাজিবের মাধ্যমে বালু বিক্রির টাকার ভাগ দেয়া হয় সবাইকে।
পরিবেশ কর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, মৌলভীবাজারে প্রায় অর্ধশতাধিক ছড়া রয়েছে। এসব ছড়া ইজারা না থাকায় নিয়মিত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এসব বালু মহাল নিয়মিত ইজারা দেওয়া হলে সরকার প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করতো। তবে সরকার ইজারা না দিয়ে বালু লুট করার সুযোগ করে দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে রাজিব উদ্দিন বলেন, অতীতে এই বড়ছড়া থেকে আওয়ামীলীগের স্থানীয় শীর্ষ নেতারা অবাধে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন। আমি বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত নই। এলাকার একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমার সামাজিক মান মর্যাদা নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। তবে এটা ঠিক স্থানীয় অনেক লোক তাদের বসতবাড়ির প্রয়োজনে বালু উত্তোলন করছেন।
বরমচাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খোরশেদ আহমদ খান সুইট বলেন, অতীতে এই বড়ছড়া থেকে একাধিকবার বালু জব্দ করিয়েছি কিন্তু পরে জব্দকৃত বালুও লুট হয়ে যায়। বর্তমানে রাতের আধারে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট চক্র বড়ছড়া থেকে অবাধে বালু উত্তোলন করছে। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আনিছুল ইসলাম বলেন, বড়ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি স্থানীয় লোকজন আমাদের জানিয়েছেন। খুব শীঘ্রই অভিযান চালিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
একুশে সংবাদ/এ.জে



একুশে সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

